আজকাল ওয়েবডেস্ক: ধ্যান শুধু মানসিক শান্তি আনে—এই ধারণা বহুদিনের। কিন্তু সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, ধ্যানের প্রভাব এর থেকেও অনেক গভীর। নিয়মিত ধ্যান মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ধরণই বদলে দিতে পারে। অর্থাৎ, ধ্যান শুধু মনকে শান্ত করে না, বরং মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং মনোযোগ ধরে রাখে, তাতেও সরাসরি প্রভাব ফেলে।


গবেষকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ধ্যান করা ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের কার্যকলাপে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। বিশেষ করে মনোযোগ, স্মৃতি, আবেগ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত অংশগুলিতে ধ্যানের ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক বা স্নায়বিক সংযোগগুলির মধ্যে সমন্বয়ও ধ্যানের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।


এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশকে নির্দিষ্ট সময় ধরে নিয়মিত ধ্যান করতে বলা হয়। অন্য একটি অংশ কোনও ধ্যানচর্চা করেনি। পরবর্তী সময়ে আধুনিক ব্রেন ইমেজিং প্রযুক্তির সাহায্যে দুই দলের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফল দেখায়, যারা ধ্যান করেছেন, তাঁদের মস্তিষ্কে আলফা ও থিটা তরঙ্গের কার্যকলাপ বেড়েছে। এই তরঙ্গগুলি সাধারণত গভীর মনোযোগ, সৃজনশীলতা এবং মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে যুক্ত।


গবেষকদের মতে, ধ্যানের ফলে মস্তিষ্কের “ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক”-এর কার্যকলাপ কমে যায়। এই নেটওয়ার্কটি তখন সক্রিয় থাকে, যখন মানুষ অতিরিক্ত চিন্তা, দুশ্চিন্তা বা আত্মসমালোচনায় ডুবে থাকে। ধ্যানের মাধ্যমে এই অযথা চিন্তার প্রবণতা কমে, ফলে মানসিক চাপ ও উদ্বেগও হ্রাস পায়।


আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আবেগ নিয়ন্ত্রণ। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ধ্যানকারীদের মস্তিষ্কে অ্যামিগডালা নামের অংশটি তুলনামূলকভাবে কম প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। অ্যামিগডালা ভয়, রাগ ও স্ট্রেসের মতো আবেগের সঙ্গে যুক্ত। এর কার্যকলাপ কমে যাওয়ার অর্থ হলো মানুষ চাপযুক্ত পরিস্থিতিতে আরও শান্ত ও যুক্তিবাদী সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়।


শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেই নয়, ধ্যানের প্রভাব শারীরিক সুস্থতার সঙ্গেও জড়িত বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত। ধ্যানের মাধ্যমে স্ট্রেস কমলে, পরোক্ষভাবে শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতিও হতে পারে।


গবেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, এই পরিবর্তনগুলি রাতারাতি হয় না। নিয়মিত এবং ধারাবাহিক অনুশীলনই এখানে মূল চাবিকাঠি। দিনে মাত্র ১০–১৫ মিনিট ধ্যান করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যকলাপে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বয়স, পেশা বা জীবনযাত্রা যাই হোক না কেন, ধ্যানচর্চার এই উপকারিতা প্রায় সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।


সব মিলিয়ে, এই গবেষণা প্রমাণ করছে যে ধ্যান কোনও আধ্যাত্মিক বা জীবনধারাভিত্তিক অনুশীলনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত পদ্ধতি, যা মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকলাপকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। ব্যস্ত ও চাপপূর্ণ আধুনিক জীবনে ধ্যান তাই হয়ে উঠতে পারে মানসিক ভারসাম্য ও সুস্থতার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।