আহমেদাবাদের এক চিকিৎসক-পরিবার ‘আকবরি’। তাঁদের ১৭ বছরের ছেলে কৃষ আকবরি। পথদুর্ঘটনার জেরে কৃষকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়৷ চিকিৎসকেরা তাঁকে ব্রেন ডেড ঘোষণা করেন৷ কৃষের বাবা ডা. রবি আকবরি, নিজেও একজন প্র্যাকটিসিং ফিজিওথেরাপিস্ট, তিনি তখন বুঝতে পারেন ছেলে কৃষকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়৷
তখন পরিবারের সঙ্গে আলোচনার পরে কৃষের অঙ্গ দান করার সিদ্ধান্ত নেয় আকবরি পরিবার৷ তিনি বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম, যদি ও বাঁচতে না পারে, অন্তত অন্যদের জীবন দিতে পারবে।” আকবরি পরিবারের এই সিদ্ধান্তে ছ'জন মানুষের জীবন বেঁচেছে, যাদের মধ্যে তিনজন কিশোর।
ডা. আকবারি বলেন, “কৃষের শেষকৃত্য চলাকালীনই, অপারেশন থিয়েটারে ভাভনগরের এক ১৩ বছরের ছেলের শরীরে ওর হৃদপিণ্ড স্পন্দিত হচ্ছিল। শেষকৃত্য শেষ হওয়ার আগেই হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পূর্ণ হয়ে যায়। এক অর্থে, আমার ছেলে এখনও বেঁচে আছে।”
কৃষের হাত দান করা হয় ফরিদাবাদের একজনকে এবং ফুসফুস দেওয়া হয় আহমেদাবাদের ২২ বছরের এক যুবককে। তাঁর দুটি কিডনি দুই কিশোরের শরীরে প্রতিস্থাপিত হয়েছে, আর কর্নিয়া দান করা হয়েছে আরও একজনকে, যা একজন মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেবে।
দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র কৃষ। ২৮ মার্চ সে পড়তে যাচ্ছিল বাইকে চালিয়ে। পথে একটি ব্যস্ত রাস্তায় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মিনি ট্রাক একটি নীলগাইকে সরাতে হর্ন দেয়। ভয়ে নীলগাইটি হঠাৎ ডিভাইডার পেরিয়ে কৃষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে ডা. আকবরি বলেন, “কৃষের কাছে নিজেকে সুরক্ষিত করার সময় ছিল না৷ নীলগাইয়ের ওজন ও ধাক্কা এতটাই বেশি ছিল যে সরাসরি ওর মুখে আঘাত লাগে। মুখের বাম দিক থেকে রক্তপাত হচ্ছিল এবং চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়রা অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করে। তখনও কৃষ সচেতন ছিল, সেই তার মায়ের ফোন নম্বর জানিয়েছিল স্থানীয়দের৷"
কৃষের বাবার মতে, খবর পেয়েই দ্রুত সেখানে তাঁরা পৌঁছেছিলেন কিন্তু ততক্ষণে অনেক রক্তক্ষরণ হয়ে গিয়েছিল।
হাসপাতালে সিপিআর (CPR) দেওয়ার পর কিছুটা হৃদস্পন্দন ফিরে আসে এবং রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে আসে, কিন্তু কৃষ অচেতন অবস্থায় ছিল। এরপর তাকে ভেন্টিলেটরে রাখা হয়।
২৯ মার্চ মারেঙ্গো সিমস হাসপাতালে এমআরআই করা হলে চিকিৎসকরা জানান, মস্তিষ্কে কোনো রক্ত সরবরাহ নেই। ডা. আকবরি বলেন, “দুর্ঘটনার সময় প্রায় ২০–৩০ মিনিট হৃদস্পন্দন বন্ধ ছিল, ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছায়নি এবং বহু ব্রেন সেল স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “শরীরের অন্যান্য অঙ্গ কিছু সময় বাঁচতে পারে, কিন্তু মস্তিষ্ক ৩০ মিনিট রক্ত না পেলে বাঁচে না। এমনকি কোমাতেও অন্তত একটি ব্রেন সেল জীবিত থাকতে হয়—কিন্তু ওর ক্ষেত্রে সেটাও ছিল না।”
ডা. আকবারি বলেন, “যদি ওকে বাঁচানোর সামান্য আশাও থাকত, আমি ওকে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে নিয়ে যেতাম। কিন্তু কোনও উপায় ছিল না।”
এরপর পরিবারের সঙ্গে অঙ্গ দানের বিষয়ে আলোচনা করেন কৃষের বাবা। তিনি বলেন, “আমি আর ওর মা সিদ্ধান্ত নিই—যতটা সম্ভব মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে।"
সরকারের কেন্দ্রীভূত অঙ্গ বণ্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষের হৃদপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনি, কর্নিয়া ও হাত দান করা হয়।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ডা. আকবরি। সরকারের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার সন্তানের সঙ্গে যা হয়েছে, তা যে কারও সঙ্গে হতে পারে। এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
গত কয়েক দিনে দেশজুড়ে বহু মানুষ এই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে ডা. আকবরি বলেন, সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে জরুরি।
“যখন জানবেন শরীর বাঁচানো সম্ভব নয়, কিন্তু অঙ্গ অন্যের জীবন বাঁচাতে পারে—তখন অঙ্গ দানের কথা ভাবা উচিত,” তিনি বলেন।
মারেঙ্গো সিমস হাসপাতালের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এটি বেসরকারি ক্ষেত্রে প্রথম হাত দানের ঘটনা।
















