পরমা দাশগুপ্ত
মধ্য তিরিশের গৃহবধূ। নিজেদের জগৎ নিয়ে দিনভর ব্যস্ত স্বামী বা সন্তান কেউই সময় দেয় না তেমন। একাকীত্ব কাটাতে তাই ডেটিং অ্যাপেই খুঁজে নিয়েছেন মনের দোসর। জীবনের সবটুকু তাঁকে না বললে যেন দিন কাটে না। সম্পর্ক মন পেরিয়ে শরীরে পৌঁছতে চাইলেও আপত্তি নেই তেমন।
মিড সিনিয়র স্তরের ব্যস্ত কর্পোরেট কর্মী। বিয়ে করেননি, পরিবার বা বন্ধুবৃত্তেও তেমন কেউ নেই। সকাল থেকে রাতে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত অফিসের ঝামেলা থেকে হতাশা, সবটাই মন খুলে বলেন ডেটিং অ্যাপে সদ্য আলাপ হওয়া বন্ধুকেই।
বছর আঠাশের তরুণী সমকামী। এদিকে বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। অগত্যা ডেটিং অ্যাপে নতুন আলাপীদের স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছেন নিজের পরিস্থিতি। বলছেন, সম মনের সমকামী পুরুষ কাউকে মনে ধরলে তাকেই বিয়ে করবেন। ঝুলিতে সমাজের টিকমার্ক নিয়ে বন্ধুর মতো কেটে যাবে বাকি জীবনটা।
চল্লিশ ছুঁইছুঁই যুবক। বাড়িতে স্ত্রীর সন্দেহবাতিক বেড়েই চলেছে ক্রমশ। সেই মানসিক ধকল ডেটিং অ্যাপে অচেনা মেয়েদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন নিশ্চিন্তে। মনের চাপ কমছে। মিলছে এ সমস্যা সামলে চলার টিপসও।
একাধিক ট্রমা পেরিয়ে কারও আবার একাই কাটছে জীবন। কিন্তু সেই ট্রমা যে গভীর ছাপ রেখে গিয়েছে শরীর-মন সর্বত্র। অকপটে সেই সত্যিটাও স্বীকার করে নেওয়া যাচ্ছে ডেটিং অ্যাপে। হাল্কা লাগছে মন।
নেশার হাতছানিতে সাড়া দিয়েছে দিয়েছেন কেউ। সঙ্গীও তো চাই। চেনা বৃত্তে বলার সুযোগ বা ইচ্ছে কোনওটাই নেই। এখানেও মুশকিল আসান হয়ে উঠছে ডেটিং অ্যাপেরই অচেনা মানুষ।
‘বাম্বল’, ‘টিন্ডার’, ‘আইল’ কিংবা ‘ট্রুলি ম্যাডলি ডিপলি’। ইন্টারনেট খুললেই ডেটিং অ্যাপের ছড়াছড়ি। অ্যাপগুলোর জন্ম হয়েছিল বন্ধুত্ব পেরিয়ে প্রেম কিংবা বিয়ের দিকে সম্পর্ক গড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে। কিন্তু দিন যত এগোচ্ছে, ততই দেখা যাচ্ছে, ডেটিং অ্যাপে মনের দরজা হাটখোলা করে দিতেই ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে বিভিন্ন প্রজন্ম। বাড়ির লোক, বন্ধু বা আত্মীয়দের চেনা বৃত্তে যে কথাগুলো বলে ওঠা হয়ে ওঠে না, অস্বস্তি হয় কিংবা সাহসে কুলোয় না, সে কথাগুলোই অনায়াসে বলে ফেলা যাচ্ছে অদেখা-অচেনা বন্ধুকে। কমছে মনের বোঝা। অকপটে অনেকেই মানছেন, স্ট্রেস-ডিপ্রেশনের কাউন্সেলিংয়ের চেয়ে এভাবে মনের কথা বলাটা অনেক বেশি সহজ এবং পকেটসই। এমনকী অ্যাপের বন্ধুর সঙ্গে দেখা করাটাও জরুরি মনে করছে না অনেকে।
নর্টন লাইফলক-এর এক সমীক্ষায় উঠে এসেছিল এ ছবিটাই। তাতে এদেশের হাজার দেড়েক শহুরে প্রাপ্তবয়স্কের ৪০ শতাংশ জানিয়েছিলেন, ডেটিং অ্যাপে আলাপ হওয়া অদেখা মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য ভাগ করে নিতে স্বচ্ছন্দ। আরও জানা গিয়েছিল, ৬৬ শতাংশ মহিলা এবং জেন এক্স প্রজন্মের ৬৩ শতাংশ ডেটিং অ্যাপে ভরসা করে মনের কথা খুলে বলতে দ্বিধা করেন না।
বিষয়টা কি সমাজের এক নতুন ছবি তুলে ধরছে? সমাজতাত্ত্বিক রামানুজ গাঙ্গুলি বলছেন, “সমালোচনা বা সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে না পারার ভয়ে নিজেদের নিরাপদ বৃত্তে নিজেদের সত্যিগুলো খুলে বলতে আজকাল অনেকেই অস্বচ্ছন্দ। বরং যে অচেনা মানুষ ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে যেকোনও মুহূর্তে হারিয়ে যেতে পারে, তাদের কাছেই মন হাটখোলা করে দিতে অসুবিধে নেই। ফলে কম খরচের ‘কনফেশনাল স্পেস’ ডেটিং অ্যাপ হয়ে উঠছে খালি ক্যানভাসের মতো, যেখানে ভাল হওয়ার, দায়িত্ববান হওয়ার দায় নেই। জীবনটা যেমন কাটছে বা এতকাল কাটছিল-র বদলে বরং কেমন ভাবে কাটাতে চায় কেউ, সেটা সহজে বলে ফেলা যাচ্ছে। তাতে নতুন আলাপ হওয়া অদেখা কেউ যদি সমালোচনাও করে, মন বা আবেগে তার রেশ থাকছেনা বেশিক্ষণ। অযাচিত উদ্বেগ, পরামর্শ, কিংবা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি না হওয়া থেকেও দূরে থাকা যাচ্ছে। এখনকার ব্যস্ত দুনিয়ায় তরুণ প্রজন্ম এমনিতেই ন্যূনতম সামাজিক পরিসরে একা হয়ে বাঁচতে অভ্যস্ত। ডেটিং অ্যাপে বরং এভাবেই নিজেদের মেলে ধরছে তারা।”
আপাত ভাবে এই অভ্যাসটাকে খারাপ বলছেন না মনোবিদেরাও। তাঁদের মতে, চেনা বৃত্তের মানুষকে অনেকেই মনের গোপন কথা কিংবা গভীরে লুকোনো ভাবনা, মন খারাপ, উদ্বেগ বা হতাশার কথা খুলে বলতে স্বচ্ছন্দ হননা। জানাজানি হলে কী হবে, লোকে কী বলবে, নিন্দা হবে কিনা— এমন সব ভয় তাড়া করে বেড়ায়। তার বদলে ডেটিং অ্যাপে আলাপ হওয়া অচেনা মানুষ, যার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হয়নি বা হয়তো হবেও না, তার কাছে মনের সব কথা খুলে বলা অনেক সহজ। কারণ সমালোচনা বা চেনা বৃত্তে জানাজানি- কোনওটারই আশঙ্কা নেই। কিন্তু সেই সঙ্গেই মনোবিদেরা এই মেলামেশার ক্ষেত্রে বাড়তি সাবধানতা অবলম্বনের কথাও মনে করিয়ে দিতে ভুলছেন না। কারণ অচেনা মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য ভাগ করে নেওয়া একদিকে যেমন সাইবার-জালিয়াতির পথ খুলে দেয়, তেমনই ইদানীং ডেটিং অ্যাপে সম্পর্কের নানা অচেনা সমীকরণ উল্টে মনের উপর চাপ বাড়িয়েও দিতে পারে। তাই নিজেকে সামলে রাখতে শেখাটাও ভীষণ জরুরি বলেই জানাচ্ছেন মনোবিদেরা।
২০২৬-এ ম্যাকফি ইন্ডিয়া-র এক সমীক্ষা বলছে, ৭৫ শতাংশ ভারতীয় ডেটিং অ্যাপে ইতিমধ্যেই ভুয়ো বা এআই প্রোফাইলের সংস্পর্শে এসেছেন। ডিজিটাল ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ পার্থপ্রতিম মুখার্জির কথায়, “ডেটিং অ্যাপে আপাত সাধারণ বন্ধুত্বের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে নানা জালিয়াতির ফাঁদ। তাতে পা দিতে না চাইলে ব্যক্তিগত তথ্য ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটু সতর্ক হতেই হবে।” যে যে সাইবার অপরাধের বিষয়ে সতর্ক করছেন পার্থপ্রতিম, সেগুলি হল—
ক্যাটফিশিং (ফেক প্রোফাইল) – আকর্ষণীয় ছবিতে ভুয়ো প্রোফাইল সাজিয়ে দ্রুত প্রেমের সম্পর্ক। বেশ কিছুদিন পরে সেই সূত্রেই টাকা চেয়ে কিংবা উপহারের টোপে প্রতারণার ছক।
ক্রিপটো বা ইনভেস্টমেন্ট স্ক্যাম – ডেটিং অ্যাপে আলাপের ফাঁকে গল্পের ছলে ক্রিপ্টো কিংবা অন্য কোনও বড়সড় বিনিয়োগের টোপ। তাতে লগ্নি করলেই প্রতারণার জালে।
সেক্সটরশন বা ছবি/ভিডিয়ো কল ট্র্যাপ – ডেটিং অ্যাপে সম্পর্ক গড়ে দ্রুত ভিডিয়ো কলের প্রস্তাব। যৌনতা নিয়ে আলাপ-আলোচনার আড়ালে স্ক্রিন রেকর্ড হতে থাকে। সেই ভিডিয়োই পরে ব্ল্যাকমেলিংয়ে কাজে লাগে। ব্যক্তিগত ছবি চাওয়াও একই ফাঁদ হতে পারে।
রেস্তোরাঁ বা বার বিল স্ক্যাম – অ্যাপে আলাপ হওয়া বন্ধু নিয়ে যায় দামি রেস্তোরাঁ বা বারে। সেখানেই বহু টাকার বিল দিতে বাধ্য হন অনেকে।
ভেরিফিকেশন কোড স্ক্যাম – অ্যাপের নতুন আলাপী জানায়, সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভেরিফিকেশন কোড পাঠিয়ে সে আপনার প্রোফাইল যাচাই করতে চায়। কোড পাঠালেই আপনার অ্যাকাউন্ট তার হাতের মুঠোয়।
ভুয়ো বিপদের গল্প – আচমকা কোনও বিপদ, বিপর্যয় বা অসুস্থতার গল্প বলে টাকা চাওয়া।
ভুয়ো ওয়েবসাইট বা সুগার ড্যাডি স্ক্যাম – যৌনতার হাতছানি দিয়ে বিভিন্ন জালিয়াতি ওয়েবসাইটে আপনাকে যেতে বাধ্য করা কিংবা শরীরের বিনিময়ে রোজগারের টোপে টাকা আদায়ের ছক।
জালিয়াতি থেকে বাঁচতে তাই পার্থপ্রতিমের পরামর্শ- “আলাপের এক-দু’দিনের মধ্যেই প্রেমের প্রস্তাব, ব্যক্তিগত ছবি চাওয়া, ক্রিপটো ট্রেডিংয়ের গল্প, অচেনা ওয়েবসাইটের লিঙ্ক, ইউপিআই ট্রান্সফার-উপহার-টাকা চাওয়ার মতো ঘটনা থেকে নিজেকে দূরে রাখাই শ্রেয়। আর হ্যাঁ, জালিয়াতরা কিন্তু সহজে ভিডিয়ো কলে দেখা দিতে চায়না।”
ডেটিং অ্যাপের অদেখা বন্ধুত্বে ইদানীং কথার স্রোত বয় অনর্গল। একা মন বাঁচতে চায় কয়েকজনকে ঘিরে। সঙ্গে একটু সাবধান হলে ক্ষতি কী, তাই না?
