রামগরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা,
হাসির কথা শুনলে বলে,
“হাসব না-না, না-না!”
সদাই মরে ত্রাসে—  ঐ বুঝি কেউ হাসে!

উপরের এই লাইন ক’টি সুকুমার রায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘রামগরুড়ের ছানা’র।  প্রধানত জ্যাঠামার্কা, অকারণ গম্ভীর ও নির্দোষ মজা-তামাশাকে খাটো চোখে দেখে নাক সিঁটকানো বিজ্ঞ বাঙালিদের কটাক্ষ করেই ‘রামগরুড়ের ছানা’ কবিতাখানা লিখেছিলেন সুকুমার রায়। বাকিটুকু ইতিহাস। কিন্তু এখন বুঝি ‘রামগরুড়ের ছানা’ হলেই বেঁচে যাবেন -এমনটাই ইঙ্গিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের!   


খুলেই বলা যাক বিষয়টি। ‘হাসিই সেরা ওষুধ’— এই প্রবাদটি আমরা সবাই দৈনন্দিন জীবনে কমবেশি শুনেছি বা বলা ভাল শুনে থাকি। কিন্তু অতিরিক্ত হাসি যে মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে, তা অনেকের কাছেই অকল্পনীয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, তীব্র হাসির ফলে শরীরের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়, যা কখনও কখনও মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। বেশ কিছু ঐতিহাসিক তথ্যও কিন্তু দিকনির্দেশ করছে এই বিষয়টির দিকে। 

 

 

অতিরিক্ত হাসিতে শরীরে কী ঘটে?

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ডায়িং অফ লাফটার’ বা হাসতে হাসতে মৃত্যুর ঘটনা সাধারণত রূপক অর্থে ব্যবহৃত হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর বাস্তব প্রমাণ রয়েছে। তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হাসির ফলে মানবদেহে কিছু বিপজ্জনক শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর প্রধান কারণগুলো নীচেদেওয়া হল:

হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ : হাসির ফলে হঠাৎ করেই রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দন বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। যাঁদের আগে থেকেই হৃদরোগ বা কার্ডিয়াক সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই আকস্মিক পরিবর্তন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঝুঁকি তৈরি করে।

শ্বাসকষ্ট : একটানা হাসতে হাসতে মানুষের পক্ষে ঠিকমতো শ্বাস নেওয়া সম্ভব হয় না। এর ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়।

ভ্যাসোভ্যাগাল সিনকোপ : হাসির দমকে কখনও কখনও ভ্যাগাস নার্ভ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এর ফলে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন হঠাৎ কমে গিয়ে মানুষ অজ্ঞান হয়ে পড়তে পারে বা কার্ডিওভাসকুলার কোল্যাপ্স হতে পারে।

শারীরিক দুর্ঘটনা: হাসির ঘোরে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া বা খাবার খাওয়ার সময় দম আটকে যাওয়ার মতো বাইরের ঝুঁকিও থাকে।

এই ঘটনাটি কেবল আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কৌতূহল নয়, প্রাচীনকাল থেকেই এ ধরনের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিক চরিত্র           

ক্রিসিপাস (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী) : ডুমুর খাচ্ছে এমন একটি গাধা দেখে অতিরিক্ত হাসতে হাসতে মৃত্যু হয় এই গ্রিক দার্শনিকের।

জিউক্লিস (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী): নিজের আঁকা একজন বৃদ্ধার হাস্যকর ছবি দেখে হাসতে হাসতে মারা যান এই চিত্রশিল্পী।

থমাস উরকুহার্ট  (সপ্তদশ শতাব্দী) : দ্বিতীয় চার্লস-এর সিংহাসন আরোহণের খবর শুনে হাসতে হাসতে মারা যান তিনি।

 

চিকিৎসকদের মতে “যদিও অতিরিক্ত হাসির ফলে মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত বিরল, তবুও এটি মানুষের শারীরিক সক্ষমতার চরম পর্যায়কে নির্দেশ করে। দৈনন্দিন জীবনে হাসির উপকারিতা অনেক, তবে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হাসির সময় অতিরিক্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।”

অর্থাৎ সহজভাবে বললে, যত হাসি তত কান্না প্রবাদটি কিন্তু একেবারে ফেলনা নয়। বুঝে-সুঝে এবং হাসি যদি নিয়ন্ত্রণে না রাখেন, তাহলে বিপদ কিন্তু আপনার-ই। 

(তথ্যসূত্র: ‘লাইভ সায়েন্স’-এ প্রকাশিত সারান প্যাপাসের প্রতিবেদন।)