আজকাল ওয়েবডেস্ক: তারাতলার গোডাউনে ভয়াবহ বিপর্যয়। হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে নির্মীয়মাণ গোডাউন। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত। এখনও আশঙ্কা করা হচ্ছে ভিতরে অনেকে আটকে রয়েছেন।

সারারাত উদ্ধারকাজ চলেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেও চলছে উদ্ধারকাজ। দুপুরে বৃষ্টির জন্য সাময়িক ভাবে উদ্ধারকাজ বন্ধ থাকলেও আকাশ পরিষ্কার হওয়ার পর ফের শুরু হয়েছে উদ্ধারকাজ।

এবার প্রশ্ন উঠছে, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গলদটা কোথায় ছিল? নির্মীয়মাণ ওই গোডাউনে প্ল্যানিংয়ে ভুল? ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভুল? এই নিয়েই আজকাল ডট ইনকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিলেন টেকনো ইন্টারন্যাশনাল নিউটাউনের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ড. সঞ্জয় দাস নিয়োগী। 

তিনি সাফ জানালেন, এই বিল্ডিং তৈরির গোড়াতেই গলদ রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘আমি ঘটনাস্থলে না যেতে পারলেও একটা ভিজুয়াল অ্যাসেসমেন্ট করেছি। প্রথম অ্যাসেসমেন্টে আমার মনে হয়েছে, এখানে কলাম আর বিমের যে জংশনটা হয়েছে সেটা অত্যন্ত ইনসাফিশিয়েন্ট। প্রপারলি যেভাবে টেকনিক্যালি হওয়া উচিত সেভাবে হয়নি।’

বিষয়টাকে আরও খোলসা করে বলতে গিয়ে তিনি জানান, ‘লোডটা তো ট্রান্সফার হয় আস্তে আস্তে। বিম থেকে কলামে, কলাম থেকে মাটির নিচে ফাউন্ডেশনে। তো এই জংশনটা যতটা শক্ত করে বানানো উচিত ছিল সেটা করা হয়নি। লক্ষ্য করবেন কিছু ছবিতে। বিমটা কলামের থেকে খুলে আসেনি, মুচড়ে গেলে যেমন হয় সেটা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুজোর প্যান্ডেলে লক্ষ্য করে দেখবেন, বাঁশের স্ট্রাকচারে কিছু ডায়াগনাল মেম্বার দেওয়া হয়। এটাকে আমরা বলি বেসিং। রিপোর্টে বলা হচ্ছিল, সকাল থেকেই তারাতলার ওই স্ট্রাকচারটা দুলছিল। এর কারণ হচ্ছে কলামে বেসিংগুলোর অনুপস্থিতি। সেটা না থাকায় মুচড়ে গেছে কলামগুলো।’

এমনকী, নির্মীয়মাণ ওই গোডাউনে কংক্রিটের স্ল্যাব আর স্টিলের বিমের মধ্যেও ঠিকঠাক সংযোগ ছিল না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বলেন, ‘এখানে কংক্রিটের স্ল্যাব স্টিলের বিমের উপরে হচ্ছে। এই দুটোকে জয়েন করানোর জন্য বিমের উপরে ছোট্ট ছোট্ট বোল্ট ওয়েল্ডিং করা হয়। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিভাষায় এটাকে বলে সি-আর কানেক্টর। এখানে সেটাও দেওয়া হয়নি। আর একটা বড় টেকনিক্যাল ফল্ট যেকোনও স্ট্রাকচারে দেখবেন, কলামটা মোটা এবং বিমটা সরু হয়। এখানে ঠিক উল্টোটা হয়েছে। বিম গুলো মোটা মোটা আর কলামগুলো সরু। সুতরাং, এখানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এবিসিডি কতটা মানা হয়েছে সেটা নিয়ে আমার একটু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। যেটুকু না মানলেই নয় সেটুকুও মানা হয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে না।’

এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে গেলে কী করা উচিত সেটাও জানিয়েছেন অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘বিল্ডিং তৈরি নিয়ে কর্পোরেশনের নির্দিষ্ট আইন আছে। সেগুলো যথাযথ ভাবে মেনে তারপর কাজে নামা উচিত। এমনকী, যিনি ইঞ্জিনিয়ার তাঁর থেকে হলফনামা নেওয়া উচিত ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডের কোড অফ প্র্যাকটিস সেগুলো সমস্ত ছাপার অক্ষরে বেরোয় এবং সেগুলো মেনেই ডিজাইনগুলো করা হয়েছে কিনা। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায় এটাকে ‘স্টেবিলিটি সার্টিফিকেট’ বলে থাকি আমরা।’

উল্লেখ্য, তারাতলার ঘটনায় দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় তিনি পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন।

একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, কলকাতায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

এই ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের প্রতি তিনি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। পাশাপাশি আহতদের পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তরফে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনায় মৃতদের প্রত্যেকের নিকটাত্মীয়কে প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে ২ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এছাড়া, আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করা হয়েছে।