আজকাল ওয়েবডেস্ক: কলকাতায় এসএফআই নেতার বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ, সম্মেলনের আগে অস্বস্তিতে বাম শিবির। রাজ্যের বাম রাজনীতিতে ফের যৌন হেনস্থার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য। এবার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এসএফআইয়ের এক পরিচিত ছাত্রনেতা। সংগঠনের ভেতর থেকেই অভিযোগ উঠেছে, কলকাতা জেলার সম্পাদকমণ্ডলীর এক মহিলা সদস্য লিখিতভাবে আর এক সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন ও মানসিক হেনস্থার অভিযোগ জানিয়েছেন। তবে অভিযোগ ওঠার পরও সংগঠনের তরফে কার্যত কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে দাবি অভিযোগকারিণী এবং সংগঠনের একাংশের।
সূত্রের খবর, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি এসএফআই রাজ্য কমিটির সদস্যও। একইসঙ্গে জেলা নেতৃত্বের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। সেই কারণেই প্রমোদ দাসগুপ্ত ভবনে বসে থাকা নেতৃত্ব তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সাহস দেখাচ্ছে না— এমনটাই অভিযোগ সংগঠনের অভ্যন্তরের একাধিক সূত্রের।
অভিযোগকারিণীর দাবি, অভিযুক্ত ছাত্রনেতা দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন এবং ভবিষ্যতে একসঙ্গে জীবন কাটানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। সেই সময় তাঁদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কও তৈরি হয়। কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন, একই সময়ে ওই নেতা একাধিক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এরপর আচমকাই সম্পর্ক থেকে সরে গিয়ে ওই ছাত্রনেতা অভিযোগকারিণীকে ‘ইন্টেলেকচুয়ালি নিম্নমানের’ বলে অপমান করেন। ঘটনার পর থেকেই ওই ছাত্রী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি।
অভিযোগ নিয়ে তিনি জেলা নেতৃত্বের কাছে গেলে নাকি তাঁকে বলা হয়, “এসব করে কিছু হবে না।” বরং তাঁকেই বোঝানো হয় বিষয়টি আর না বাড়ানোর জন্য। সংগঠনের ভেতরে অনেকেই বলছেন, অভিযুক্ত ছাত্রনেতা জেলার সম্পাদক বা সভাপতির দৌড়েও রয়েছেন এবং নিজের প্রভাব খাটিয়ে ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জায়গা পাকা করার চেষ্টা করছেন।
জানা যাচ্ছে, ওই ছাত্রনেতা কলকাতা জেলার উত্তরের দিকে এক অঞ্চলিক কমিটির সদ্য প্রাক্তন সম্পাদক। উত্তর ও মধ্য কলকাতার বাম নেতৃত্বের একাংশ তাঁকে ভবিষ্যতের মুখ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে বলেও সংগঠনের ভেতরে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে ১১ থেকে ১৩ মার্চ কলকাতা জেলার এসএফআইয়ের জেলা সম্মেলন হওয়ার কথা। সম্মেলনের আগে এই অভিযোগ সামনে আসায় সংগঠনের অন্দরে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারিণীর বক্তব্য, তাঁর অভিযোগের কোনও সদুত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। বরং উল্টে তাঁকেই চাপ দেওয়া হচ্ছে যে তিনি নাকি সম্মেলনকে প্রভাবিত করার জন্য এই অভিযোগ তুলছেন। সংগঠনের জেলা সম্পাদক ও সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাঁরা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। প্রয়োজনে অভিযুক্ত ছাত্র নেতাকে 'বুলডোজার চালিয়ে হলেও নেতা করা হবে' বলে প্রচ্ছন্ন চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে বলে সূত্র মারফত জানা গেছে।
উলেখ্য এর আগে দমদম–লেকটাউন অঞ্চলের এক ছাত্রনেতার বিরুদ্ধেই এসএফআইয়ের এক মহিলা নেত্রী অভিযোগ করেছিলেন, তিনি বারবার মদ্যপানের প্রস্তাব দেন, ফাঁকা ফ্ল্যাটে ডাকেন এবং যৌন সম্পর্কের জন্য চাপ দেন। সেই অভিযোগপত্র সামাজিক মাধ্যমে ভাইরালও হয়। অভিযোগকারিণীর দাবি ছিল, তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাঁকে সংগঠনের কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি রাজ্য সিপিএমের ফেসবুক পেজে সংবাদ পাঠিকা হওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তাও নাকি ভেস্তে যায়।
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে যে, তাঁকে দিয়ে অন্য এক কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা যৌন হেনস্থার অভিযোগ সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন ওই নেতা। সংগঠনের ভেতর থেকেও তখন একাধিক কর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।
উত্তর ২৪ পরগনার এক প্রাক্তন ছাত্রনেতা, যিনি বর্তমানে যুব সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, দাবি করেন যে অভিযুক্ত ওই নেতা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সংগঠনের সম্মেলন আটকে রেখেছিলেন। যখনই মনে হয়েছে কমিটির নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হতে পারে, তখনই তিনি সম্মেলন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করেছেন। এমনকি সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও তাঁর ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ।
সেই সময় আরও এক মহিলা কর্মীর দাবি, তাঁকেও ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনায় সংগঠনের অন্দরে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ জমছিল বলে জানা যাচ্ছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেন, উত্তর ২৪ পরগনার এক শীর্ষ সিপিএম নেতার মদতেই ওই ছাত্রনেতা এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। জেলা নেতৃত্বের একাংশও নীরব থেকেছে বলে অভিযোগ। এমনকি ছাত্র জেলা কমিটির এক বৈঠকে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও সংগঠনের একাংশের দাবি।
সেই সময় সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে অভিযুক্ত ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে একাধিক স্ক্রিনশট, ভয়েস মেসেজ এবং অভিযোগপত্রের কপি। যদিও সেগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। তবু বিষয়টি ভাইরাল হওয়ায় সংগঠনের অস্বস্তি আরও বেড়ে যায়।
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে বাম সংগঠনের ভেতরে একাধিকবার যৌন হেনস্থার অভিযোগ সামনে এসেছে। কয়েক মাস আগে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের দলীয় দফতরেই এক মহিলা কর্মী প্রকাশ্যে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছিলেন। ২০২৫ সালেই কলকাতা জেলে ডি ওয়াই এফ আই-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত যুব নেতার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। আবার এক সিটু নেতার বিরুদ্ধেও এক এসএসসি চাকরিপ্রার্থীর হয়রানির অভিযোগ সামনে আসে।
প্রতিবারই দলীয় নেতৃত্ব শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তদের রক্ষা করতেই নেতৃত্ব সক্রিয় থেকেছে।
এবার কলকাতা জেলার এসএফআই সম্মেলনের আগে নতুন এই অভিযোগ সামনে আসায় বাম রাজনীতির অন্দরে অস্বস্তি আরও বেড়েছে। সম্মেলনের মঞ্চে এই অভিযোগ নিয়ে কোনও আলোচনা হয় কি না এবং দল অভিযোগের গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেয় কি না, এখন সেদিকেই নজর সংগঠনের একাংশের।
