আজকাল ওয়েবডেস্ক: মন্ডপে সরার উপরে আঁকা, কনে বেশে সরস্বতী। তাকালে চোখে পড়বে একটি চিঠিও। তাতে লেখা, 'ওরা বলছে আমাকে নাকি অন্য কার একটা বাড়িতে চলে যেতে হবে। ওখানে নাকি খাতা পেন্সিল ধরলে খুব বকবে সবাই।' এই চিঠি লক্ষ্মীকে লিখেছে সরস্বতী।

 

 সরস্বতী পুজো, আরাধনা, পূজাচারতো থাকেই। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে পোশাক শিল্পী দেবাশিস এই পুজোর মাধ্যমেই সমাজকে বার্তা দিয়ে চলেছেন। চলতি বছরও তার অন্যথা নয়। চলতি বছরেও, বিশেষ ভাবনা পোশাক শিল্পী দেবাশিসের। 

ফি বছর, নিজের হাতেই পুজোর সিংহভাগ আয়োজন করেন তিনি। সঙ্গ দেয় পাড়ার কচি-কাচারা, ছোট বেলার বন্ধুরা। চলতি বছর বাল্যবিবাহ রুখতে, মানুষের সচেতনতা বাড়াতে দেবাশিসের পুজোর থিম, 'সোহাগ নয়, শিক্ষা চাই।' ছোটবেলা থেকেই মূলত সরস্বতী পুজো নিয়ে আগ্রহী তিনি। সেই যে ছোট এব্লায় জনা কয়েক বন্ধু মিলে, গলির ভিতর কঞ্চি বেঁধে, কাপড় ঘিরে সরস্বতী পুজোর শুরু করেছিলেন, খইয়ের মালা গেঁথেছিলেন, এখনও তার অন্যথা হয়নি। এবারও নিজেরাই প্যান্ডেল বেঁধে, পুজোর আয়োজন করছেন। দেবাশিসের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন শরদিন্দু, সন্দীপন, ভাগ্যজিত, শুভঙ্কররা। 

তবে, চলতি বছরে, সরার উপরে লক্ষ্মীর মতো সরস্বতীকে এঁকেছেন তিনি। যেখানে সরস্বতীকে ফুটিয়ে তুলেছেন বালিকা হিসেবে। পরনে শাড়ি, কপলে চন্দনের ফোঁটা। যেন, অল্প বয়সেই, ঘরের মেয়ে সরস্বতীকে তৈরি করা হয়েছে বিয়ের জন্য। সাজানো হয়েছে কনের বেশে। দেবাশিসের পোশাকের নকশাতেও বরাবর ফুটে  ওঠে তাঁর নিজস্ব স্টাইল, এবারের সরস্বতীও এঁকেছেন সেই আদলেই। পুজোর জন্য যদিও থাকছে প্রতিমাও। গড়েছেন সুমিত বিশ্বাস। 

এই ভাবনা নিয়ে কী বলছেন শিল্পী নিজে। বলছেন, 'শিক্ষা প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু এই অধিকারের অন্তিম ফলাফল কেবলমাত্র জীবিকা নির্বাহ করা নয়। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সামাজিক বন্ধন থেকে নিজেকে মানসিকভাবে মুক্ত করা। আমাদের দেশে ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ২৩.৩ শতাংশ নারী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। তাদের জীবন থেকে শিক্ষা নামক সেই মৌলিক অধিকারটি চিরদিনের মত মুছে গিয়েছে। বহু মেয়েই স্রেফ এই কারণে নিজেকে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে মুক্ত করার সুযোগটুকু পেয়ে ওঠে না। সমাজে নারীর পুরুষের সমান অধিকার তৈরীর অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় এই বাল্যবিবাহ। নিষ্পাপ এক শিশু চিরদিনের মত হারিয়ে যায় এক শিক্ষাবিহীন অন্ধকার জগতে। সেই কারণেই আমার এবারে উদ্যোগ এই বিষয়ে।' 

 

এই প্রসঙ্গে দেবাশিস বলছেন আম্বেদকর কথা। বলছেন, 'আম্বেদকর বলেছেন একজন পুরুষকে শিক্ষাদান করলে কেবলমাত্র একটি মানুষ শিক্ষিত হয়। কিন্তু একজন নারীকে শিক্ষাদান করলে একটি গোটা পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং একটি সমাজ শিক্ষিত হয়।'  

দেবাশিসের আর্জি, 'সরস্বতী পূজায় আমরা যখন মায়ের আরাধনা করি তখন এই মায়ের সন্তানদের জন্য আমাদের সকলের বিশেষ প্রার্থনা অত্যন্ত প্রয়োজন। আসুন আমরা সকলে মিলে প্রয়াস করে আগামী দিনে এই ফুলের মত হাত দুটিতে শাঁখা পলা নয় - খাতা কলম তুলে দিই।' মণ্ডপ সজ্জায় থাকছে কাঁচা হাতের লেখা চিঠিও। সরস্বতী, লিখেছে লক্ষ্মীকে। লিখেছে, 'তুমি ওদের বলো না, আমাকে ওই বাড়িতে না পাঠাতে। আমার একটুও যাওয়ার ইচ্ছে নেই।'