গোপাল সাহা
ভয় নয়, চিকিৎসাই করবে জয়। আর সেই কথাকেই সত্যি প্রমাণিত করে চলেছে আর জি কর হাসপাতাল একের পর এক বিরল রোগের অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসায় সাফল্যের মধ্যে দিয়ে। গাইনোকোলজি ও নবজাতক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বিভাগের চিকিৎসকদের যৌথ প্রচেষ্টায় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এক বিরল রোগের চিকিৎসা করে মধ্যে দিয়ে এক প্রসূতি মায়ের সন্তান-সহ সুস্থ জীবন ফিরিয়ে দিলেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা।
এক বিরল রোগের নাম পার্শিয়াল মোলার প্রেগনেন্সি। যার ফলে সেই মহিলা অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গর্ভে সন্তানের পাশাপাশি একটি মোলার বা আঙুরের থোকার মত টিউমার বিরাট অংশ জুড়ে মাতৃগর্ভে বাচ্চার চারিপাশে ঘিরে থাকে। যা অতীব বিপজ্জনক। যার কারণে ভ্রুণের মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠা থমকে যায়। সিংহভাগ জায়গা জুড়েই বেড়ে ওঠে এই টিউমার। এর ফলে সেই অন্তঃসত্ত্বা মায়ের যেমন জীবনহানি হতে পারে, তেমনই আশঙ্কা থাকে ক্যান্সারেরও। পাশাপাশি গর্ভে থাকা সেই শিশুর ও মৃত্যু ঘটতে পারে। আর এই রোগ সারা বিশ্বে অতীব বিরল। চিকিৎসকদের মতে শহর কলকাতা তথা রাজ্যে এ ধরনের রোগী অর্থাৎ অন্তঃসত্ত্বা সম্প্রতিক অতীতেও দেখা যায়নি। এমনকি গত ৫০ বছরে আর জি কর হাসপাতালও এই ধরনের রোগীর সন্ধান পায়নি বলেই দাবি করছে চিকিৎসকরা।
আংশিক মোলার প্রেগন্যান্সি (Partial Molar Pregnancy) হল এমন একটি অকার্যকর গর্ভধারণ যেখানে একটি ডিম্বাণু দু’টি শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হয় (বা একটি শুক্রাণু নিজেই দ্বিগুণ হয়ে যায়)। এর ফলে স্বাভাবিক ৪৬টি ক্রোমোজোমের বদলে মোট ৬৯টি ক্রোমোজোম তৈরি হয়। এতে অস্বাভাবিক প্লাসেন্টা তৈরি হয় এবং কিছু ভ্রূণের টিস্যু থাকতে পারে, কিন্তু এই ভ্রূণ বেঁচে থাকতে পারে না। এই অবস্থার চিকিৎসার জন্য সাধারণত সাকশান ও ইভ্যাকুয়েশন (S&E) পদ্ধতিতে জরায়ুর ভিতরের অস্বাভাবিক টিস্যু অপসারণ করা হয়। এরপর রোগীর hCG হরমোনের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আংশিক মোলার প্রেগন্যান্সির প্রধান দিকগুলি-
কারণ
এই অবস্থায় ভ্রূণটি বাবার কাছ থেকে দুই সেট এবং মায়ের কাছ থেকে এক সেট ক্রোমোজোম পায়। ফলে মোট তিন সেট ক্রোমোজোম তৈরি হয়, যাকে ট্রিপ্লয়েডি (Triploidy) বলা হয়।
উপসর্গ
গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে অস্বাভাবিক বা বেশি রক্তপাত, তীব্র বমি বমি ভাব ও বমি, প্রত্যাশার তুলনায় বেশি hCG হরমোনের মাত্রা।
রোগ নির্ণয়
আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় প্লাসেন্টা অনেক সময় আঙুরের থোকার মতো (grape-like) বা মৌচাকের মতো (honeycomb) দেখা যায়। চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য হিস্টোপ্যাথোলজিক্যাল পরীক্ষা করা হয়।
ঝুঁকি
প্রায় ১% বা তারও কম ক্ষেত্রে এটি স্থায়ী গেস্টেশনাল ট্রফোব্লাস্টিক ডিজিজ (Gestational Trophoblastic Disease)-এ পরিণত হতে পারে, যেখানে কেমোথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। তবে এই ঝুঁকি সম্পূর্ণ মোলার প্রেগন্যান্সির তুলনায় কম।
চিকিৎসা পদ্ধতি
সাধারণত সাকশান ও ইভ্যাকুয়েশন পদ্ধতির মাধ্যমে জরায়ুর ভিতরের মোলার টিস্যু অপসারণ করা হয়।
পরবর্তী পর্যবেক্ষণ
চিকিৎসার পরে প্রায় ৬ মাস পর্যন্ত নিয়মিত hCG হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মোলার টিস্যু আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে না।

এই বিষয়ে চিকিৎসক প্রফেসর অভিজিৎ রক্ষিত আজকাল ডট ইন-কে বলেন, “এই ধরনের রোগ সচরাচর দেখা যায় না। এ ধরনের ঘটনা তখনই ঘটে যখন শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন কিংবা ফার্টিলাইজেশন হয়। প্রথমে এই মহিলার গর্ভধারণ নিয়ে একটা বড় সমস্যা হচ্ছিল। পরবর্তীতে চিকিৎসার পরে গর্ভধারণ করেন এই মহিলা। এরপর বেশ কিছু সপ্তাহ পরে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় গর্ভে বাচ্চার পরিমাণ ছোট আর সিংহভাগ নিয়ে দূরে রয়েছে এই মোলার বা ছোট ছোট টিউমার আঙুরের থোকার মত। আর যার কারণে বাচ্চার বৃদ্ধি পর্যন্ত প্রায় থমকে গেছে। সেখান থেকেই শুরু হয় আর জি কর হাসপাতালে চিকিৎসা পর্ব। মাঝে আরও কিছু জটিলতা তৈরি হয়। চিন্তা হয়ে গিয়েছিল কীভাবে সন্তান এবং মাকে সুস্থ ভাবে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেব। দীর্ঘ পরিশ্রম ও চিকিৎসক ও নার্সদের ঐকান্তিক সহযোগিতা ও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই সাফল্য এসেছে। তবে একটা বিষয় খুবই সত্যি লাগছে যে প্রসূতি মায়ের ক্যান্সারের মতো ভয়ংকর রোগের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে এখনো আমাদের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার তাঁকে ছুটি দেওয়া হচ্ছে। মা এবং সন্তান উভয়ই সুস্থ রয়েছেন।”

এই বিষয়ে আর জি কর হাসপাতালের চিকিৎসক তথা এমএসভিপি সপ্তর্ষি চ্যাটার্জী বলেন, “পার্শিয়াল মোলার প্রেগনেন্সি অতি বিরল প্রকৃতির এক রোগ এবং তার চিকিৎসা। আর জি করের হাসপাতালের এই বিরল রোগের চিকিৎসা এবং মা ও সন্তানকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সুস্থভাবে, যা চিকিৎসকদের এক বিরাট সাফল্য। আমাদের এই আর জি কর হাসপাতাল চিকিৎসায় পূর্বের থেকে আরও অনেক বেশি এগিয়ে এসেছে। আবারও সেরার সেরা তকমা আমাদের হাসপাতালেই পাবে বলে আমার বিশ্বাস। আর জি কর হাসপাতাল প্রায় ২৫-২৬ স্থানে চলে গিয়েছিল। যা আবার প্রথম দিকে অর্থাৎ প্রথম ১০-এর মধ্যে ফিরে এসেছে রোগীর চিকিৎসা ও তার সাফল্যের মধ্যে দিয়ে।”
প্রসূতির স্বামী হুগলি কামারকণ্ডুর বাসিন্দা সৈয়দ মোকারম হোসেন আমাদের সংবাদমাধ্যমে মুখোমুখি হয়ে বলেন, “মা এবং বাচ্চা দু’জনেই ভাল আছেন। ডাক্তার বাবুরা এবং আর জি কর হাসপাতাল ভগবান ও মন্দিরের মতো আমাদের জীবনে। না হলে হয়তো আজকে আমার স্ত্রী এবং সন্তানকে ফিরে পেতাম না। হাসপাতালেও আমার স্ত্রীর পূর্ণ সহযোগিতা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার কোনও ত্রুটি রাখেনি। চিকিৎসক অভিজিৎ রক্ষিত বাবুকে এবং অন্যান্য চিকিৎসকদের আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।”
