আজকাল ওয়েবডেস্ক: তৃণমূলের দুই নেতার হয়ে আলদাতে সওয়াল করা নিয়ে প্রবীণ আইনজীবী তথা বর্ষীয়ান বাম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে তীব্র আক্রমণ শানালেন তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু তৃণমূলই নয়, খোদ বাম শিবিরের অন্দরেও তীব্র বাদানুবাদ ও টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব বনাম রাজনৈতিক আদর্শের এই সংঘাত এবার ভার্চুয়াল দুনিয়া পেরিয়ে বাংলার রাজনীতির মূল মঞ্চে চলে এল।
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার, যখন আয়বহির্ভূত সম্পত্তি এবং নির্বাচনী হলফনামায় ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তারির আশঙ্কায় কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন রাজারহাট-গোপালপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অদিতি মুন্সি এবং তাঁর স্বামী তথা বিধাননগরের মেয়র পারিষদ দেবরাজ চক্রবর্তী। শুক্রবার হাইকোর্টে তাঁদের আগাম জামিনের এই মামলায় সওয়াল করেন স্বয়ং বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। আদালতে রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার দাবি করেন, অদিতি এবং দেবরাজ নির্বাচনের আগে প্রায় ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বেনামে ও আত্মীয়দের নামে হস্তান্তর করেছেন তোলাবাজি এবং জমি দখলের মাধ্যমে।
এর জবাবে বিকাশবাবু পাল্টা যুক্তি দেন, সম্পত্তি অন্য কারও নামে হস্তান্তর করা বা হলফনামায় ভুল তথ্য দেওয়া বড়জোর নির্বাচনী বিধিভঙ্গ হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই ফৌজদারি অপরাধ নয়। এমনকি তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ওঠা অতীতে হলফনামা সংক্রান্ত বিধিভঙ্গের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। শেষ পর্যন্ত বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত আগামী ১৯ জুন পর্যন্ত অদিতি ও দেবরাজকে গ্রেপ্তার বা কোনও পুলিশি পদক্ষেপ না করার মৌখিক নির্দেশ দেন।
আদালতের এই স্বস্তির পরই রাজনৈতিক মহলে ঝড় তোলেন কল্যাণ ব্যানার্জি। ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট করে শ্রীরামপুরের সাংসদ বিকাশবাবুর বিরুদ্ধে তীব্র নীতিগত দ্বিচারিতার অভিযোগ তোলেন। কল্যাণের স্পষ্ট প্রশ্ন, যিনি দিনের পর দিন নিজেকে রাজ্যে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ের প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যিনি আদালতে সওয়াল করে ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি বাতিলের পক্ষে রায় এনেছেন, তিনিই আজ দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত দুই তৃণমূল নেতার পক্ষে কীভাবে দাঁড়াতে পারেন? পেশাগত দায়িত্বের আড়ালে একদিকে বেছে বেছে একটি পক্ষকে নিশানা করা আর অন্যদিকে একই ধরনের অভিযুক্তদের আড়াল করার এই মানসিকতা দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়। এর পাশাপাশি কল্যাণ ব্যানার্জি এই ঘটনার পেছনে বিজেপি এবং সিপিএমের মধ্যে কোনও গোপন রাজনৈতিক আঁতাত রয়েছে কিনা, সেই প্রশ্নও তুলেছেন।
বিকাশবাবুর এই ভূমিকার পর সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজনৈতিক বৃত্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সিপিএমের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেই এই নিয়ে আড়াআড়ি বিভাজন স্পষ্ট। দলের একটি বড় অংশ ক্ষোভে ফুঁসছে, তাদের দাবি অবিলম্বে দলবিরোধী এই কাজের জন্য বিকাশবাবুকে বহিষ্কার করা হোক। অন্য অংশ অবশ্য ‘রাজনীতি ও পেশা সম্পূর্ণ আলাদা’—এই চিরন্তন যুক্তি দিয়ে প্রবীণ নেতার পাশেই দাঁড়াচ্ছেন। এর মাঝেই সমালোচকদের একাংশকে ‘মূর্খ’ বলে কটাক্ষ করে বিতর্ক আরও উস্কে দিয়েছেন খোদ বিকাশবাবু।
চলমান এই তুমুল বিতর্কের মাঝেই ফেসবুকে একটি অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করেছেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি সেখানে বিখ্যাত মার্কিন আইনজীবী ক্লারেন্স ডারোর জীবনীর প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। বিকাশবাবু লিখেছেন, কীভাবে ডারো সাহেব ডারউইনের বিবর্তনবাদের পক্ষে সওয়াল করে সামাজিক ও ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন এবং কীভাবে তথাকথিত মিডিয়া ও স্বার্থান্বেষী শক্তির কুৎসার শিকার হয়েও এক জঘন্য খুনির হয়ে আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা টেনে বিকাশবাবু লিখেছেন যে, তাঁর ক্ষেত্রেও আজ সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল এবং ছদ্মবেশী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি একজোট হয়েছে। তবে তিনি বিনয়ের সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি নিজেকে মহান ডারোর সঙ্গে তুলনা করছেন না, কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি মনে করাচ্ছেন।
বিকাশবাবু যখন খোদ নিজের দলের নিচুতলার কর্মী ও বিরোধী শিবিরের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়ে কিছুটা ব্যাকফুটে, ঠিক তখনই তাঁর সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন সিপিএমের বর্তমান রাজনৈতিক জোটসঙ্গী ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। নিজের ফেসবুক ওয়ালে ‘ভাইজান’ হিসেবে পরিচিত নওশাদ সরাসরি বিকাশবাবুর পক্ষে ব্যাট ধরে লিখেছেন, "বিকাশ ভট্টাচার্য স্যারের প্রতি বিষোদ্গার, মুণ্ডুপাত করতে গিয়ে অজান্তে শাসকদলের আইটি সেলের হয়ে কাজ করছি না তো?" অর্থাৎ, নওশাদ ইঙ্গিত করতে চেয়েছেন যে এই পুরো বিতর্কটি আসলে বিরোধীদের তৈরি করা একটি সামাজিক ফাঁদ। অতীতেও বিভিন্ন মামলায় বিকাশবাবুর প্রতি নওশাদের গভীর শ্রদ্ধা ও রাজনৈতিক ভরসা দেখা গেছে। ফলে, এই কঠিন সময়ে বাম নেতার সমর্থনে নওশাদের এই বার্তা বাংলার জোট রাজনীতির সমীকরণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।















