আজকাল ওয়েবডেস্ক: কার্তিক মাস, দ্বিতীয়ার দিন হয় ভাইফোঁটা। সে এক মহাসমারোহ। কোথাও উদযাপন হয় প্রতিপদেও। খাওয়া দাওয়া, সঙ্গে উপহার আর অবশ্যই ফোঁটা এবং সঙ্গে ধান আর দুব্য। সঙ্গে থাকে প্রদীপের আলো। কিন্তু কেন হয় এই ভাইয়ের মঙ্গলকামনা? এর পেছনে কী আছে লুকিয়ে? 

 

 

ভাইফোঁটা দিতে গিয়ে বোনেরা ছড়া কাটেন। সেই ছড়ায় বলা হয়,

ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, 

যমের দুয়ারে পরলো কাটা

যমী (যমুনা) দেয় যমকে ফোঁটা, 

আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।

 

 

কে এই যম আর যমী? এদের উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্বেদে। দশম মন্ডলে তাঁদেরকেই বলা হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম পুরুষ এবং নারী। বলা হয়, যমই সেই মানুষ যাঁর পৃথিবীতে প্রথম মৃত্যু হয়। বিবস্বত অর্থাৎ সূর্যের যমজ পুত্র-কন্যা এই যম আর যমী। এর পরের সূক্তে যম আর যমীর সম্পর্ক নিয়ে যা বলছে বেদ, তাতে চমকে উঠতে হয়।

 

 

ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের দশম সূক্তের চোদ্দ নম্বর শ্লোক বলছে, এক নির্জন দ্বীপে এসে ভাই যমের সহবাস চান বোন যমী। তাঁকে বলতে শোনা গেল- “বিস্তীর্ণ সমুদ্রমধ্যবর্তী এ দ্বীপে এসে, এ নির্জন প্রদেশে তোমার সহবাসের জন্য আমি অভিলাষিণী!” যম কিন্তু বোনের সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন না। তাঁর মনে হল, এ বিশুদ্ধ অজাচার। যদিও সেসময় ভাই বোনের বিয়ে বা সহবাস অন্যায় কিছু ছিল না। যমী তো নাছোড়বান্দা। কিন্তু যমকে রাজি করাতে পারলেন না। তাঁর যুক্তি ছিল, যেহেতু তারা যমজ, মাতৃগর্ভে একসঙ্গে ছিলেন সেহেতু বিধাতাই চায় তাদের মিলন হোক এতে অপরাধের কিছু নেই। যম স্পষ্ট তাঁর অমত জানিয়ে দিলেন। 

 

 

 

কিন্তু, যমী নিরস্ত হলেন না। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে চলে গেলেন সেই নির্জন দ্বীপের অন্য প্রান্তে। ফিরেও এলেন কিছুক্ষণ পরেই! ফিরে এসে যমী চমকে উঠলেন। দেখলেন, একটি গাছের তলায় শুয়ে রয়েছেন যম। তাঁর দেহে প্রাণ নেই। যমীর বিরহদশা দূর করতে তখন তৎপর হলেন দেবতারা। তাঁরা যমীকে সান্ত্বনা দিলেন, কিন্তু তাঁর কান্না বন্ধ হল না। 

 

 

 

বেদ যেখানে শেষ করেছে যম আর যমুনার উপাখ্যান। পুরাণ শুরু হয়েছে সেখান থেকেই। যমকে হারিয়ে যমী কান্নায় নদী হয়ে ভেসে যান পৃথিবীতে, তখন তাঁর নাম হল যমুনা। কৃষ্ণের অগ্রজ বলরাম বলপূর্বক বিবাহ করেন তাঁকে। অতঃপর আসে সেই শুভক্ষণ। মৃত্যুর পর যম এখন নরকের অধিপতি, যাদবকুলে ভগিনীর বিবাহ হয়েছে জানতে পেরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চলে এলেন তিনি। দিনটা কার্তিক শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া। যমকে দেখে তখন যমুনা তাঁর কপালে পরিয়ে দিলেন টীকা! তাঁকে খেতে দিলেন নানান সুস্বাদু মিষ্টান্ন। খুশি হয়ে যম কথা দিলেন, এরপর যে নারী এই ব্রত করবে, তাঁর ভাইয়ের আয়ু বৃদ্ধি পাবে। যমের মতো সে অকালে বোনকে ছেড়ে চলে যাবে না। এভাবে ঋগ্বেদের আখ্যানকে লোকাচারে বাঁধল লোককথা।