আজকাল ওয়েবডেস্ক: এক ভয়াবহ লরি দুর্ঘটনার পর প্রায় নিশ্চিত ছিল পা কেটে ফেলতে হবে, এমনই মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটির বাসিন্দা ৩১ বছরের রিজাউদ্দিন মণ্ডল।
কিন্তু আরজিকর হাসপাতালে তৈরি হল ইতিহাস। মৃতদেহের হাড় থেকে জটিল অস্ত্রোপচারে নতুন করে জীবন ফিরে পেলেন রিজাউদ্দিন। জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালে এক দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হন রিজাউদ্দিন।
উরুর নিচের অংশের হাড় ডিস্টাল ফিমার ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই বছরের মে মাসে প্রথম অস্ত্রোপচার হয়। তবে অস্ত্রোপচারের পর হাঁটু সংলগ্ন অংশে গভীর ক্ষত তৈরি হওয়ায় জুনে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে তা ঢেকে দেওয়া হয়।
কিন্তু এরপরেও জটিলতা কাটেনিয বরং আগস্টে ফের অস্ত্রোপচার করতে হয় তাঁকে। ২০২৪ সালে পরীক্ষায় ধরা পড়ে, উরুর হাড়ে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। জুলাই মাসে রোগীর নিজের প্যাটেলা থেকে গ্রাফট নিয়ে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা হলেও তা ব্যর্থ হয়।
পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। চিকিৎসকদের সামনে তখন খোলা ছিল দুটি কঠিন পথ, টিউমার প্রোস্থেসিস বসানো অথবা পা কেটে ফেলা। রিজাউদ্দিনের কম বয়স ও ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রার কথা মাথায় রেখে চিকিৎসকরা হাঁটু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেন।

অ্যালোগ্রাফটের মাধ্যমে ডিস্টাল ফিমার পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করা হয়। তবে তরতাজা ক্যাডাভারিক অ্যালোগ্রাফট অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং কলকাতায় সহজলভ্য নয়।
হাসপাতাল প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর রাজ্য সরকারের মানবিক উদ্যোগে অ্যালোগ্রাফট কেনার জন্য ২.৪ লক্ষ টাকা মঞ্জুর করা হয়। রোগীর সিটি স্ক্যান থেকে থ্রি-ডি মডেল তৈরি করে বিশেষজ্ঞ সংস্থার কাছে পাঠানো হয়।
এরপর প্রয়োজনীয় পরিবেশে সংরক্ষিত তাজা ক্যাডাভারিক অ্যালোগ্রাফট সংগ্রহ করে গত মঙ্গলবার হায়দরাবাদ থেকে আনা হাড় দিয়ে সফলভাবে ডিস্টাল ফিমার বসানো ও ফিক্সেশনের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
চিকিৎসকদের দাবি, পূর্ব ভারতে এই প্রথমবার ডিস্টাল ফিমারের অ্যালোগ্রাফট পুনর্গঠনের সফল অস্ত্রোপচার করা হল আরজিকর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগে।
বর্তমানে রিজাউদ্দিনের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে তাঁর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার বিষয়ে আশাবাদী চিকিৎসকরা।

এই প্রসঙ্গে হাসপাতালের এমএসভিপি চিকিৎসক সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘পূর্ব ভারতে এই প্রথম কলকাতার আরজিকর হাসপাতালে এমন অস্ত্রোপচার হল। হায়দরাবাদ থেকে হাড় এনে এই অপারেশন করা হয়েছে। রাজ্য সরকারের সহযোগিতা ও চিকিৎসকদের সাফল্য সত্যিই গর্বের। সবচেয়ে বড় কথা, রোগী আবার নিজের পায়ে হাঁটতে পারবে, এটাই আমাদের প্রাপ্তি।’
অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান চিকিৎসক সঞ্জয় কুমার জানান, ‘পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে। তবে এখন রোগী আগের তুলনায় অনেকটাই ভালো। ধীরে ধীরে হাঁটার চেষ্টা করছে। এত বড় অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হতে সময় লাগে, কিন্তু আমরা আশাবাদী, সে আবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে পারবে।’
