বিভাস ভট্টাচার্য: ঝাঁকের কই কাকে বলে? বাংলা বাগধারা অনুযায়ী এই বাক্যটির অর্থ একই দলের লোক, একই স্বভাবের মানুষ বা একই মতাদর্শের অনুসারী। যেখানে বিরোধিতা করা বা বিরোধী ভাবনা ভাবা একেবারেই আসে না। ভাবলেই তুমি আর ঝাঁকের কই নও। পরিণতি? এককথায় উত্তর-পুরোটাই নির্ভর করে ঝাঁকের যিনি মাথা তাঁর মানসিকতার উপর। তিনি যদি খোলা মনের মানুষ হন তবে ঝাঁকে প্রশ্ন তোলা লোকটিকে ডাকবেন এবং তাঁর কথা শুনে যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্ত নেবেন। আর যদি তিনি তা না হন তবে যে 'কই মাছ'টি প্রশ্ন তুলেছে সে ধীরে ধীরে কোনঠাসা হয়ে যাবে। গুরুত্বহীন হয়ে যাবে। এই ভারতেই ফিরে আসবে 'মহাভারত'-এর যুগ। যেখানে পিতামহ ভীষ্মর শরশয্যার সব শর এসে বিঁধবে প্রশ্ন তোলা ওই লোকটির 'পিঠে'। রাজ্য সিপিএমের তরুণ নেতা প্রতীক উর রহমান-এর অবস্থাও এখন ঠিক তাই। অন্তত বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত তাঁর সাক্ষাৎকার এবং সেই সাক্ষাৎকারে বেরিয়ে আসা তাঁর ক্ষোভ দেখে এটা মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।
নৃপেন চক্রবর্তী থেকে সৈফুদ্দিন চৌধুরী, সমীর পুততুন্ড, অনুরাধা পুততুন্ডু। হালফিলে প্রতীক উর। তাবড় তাবড় এই সিপিএম নেতাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এরা দল ছেড়েছিলেন নতুন চিন্তাভাবনা দলকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে। এঁদের মধ্যে নৃপেন চক্রবর্তীকে দল বহিস্কার করেছিল। সমালোচনা করায়। না, একথা কেউ বলতে পারবেন না এঁদের কারুর বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র কোনও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। প্রতীক উর এখনও দল ছাড়েননি। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির কিছু অভিযোগ কখনও শোনা যায়নি।
বামপন্থী দলে একটা কথা খুব চালু-গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা। তার একটি বৈশিষ্ট্য হল কোনও কিছুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে প্রত্যেক সদস্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা অধিকার। বৈঠকে উপস্থাপিত বিষয়টি বিরোধী মতাবলম্বীদের পছন্দ না হলে তাঁরা তাঁদের যুক্তি দিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা করতেই পারেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাঁকে সেই সভাতেই আলাদা করে চিহ্নিত করা হবে।
অতীতের উদাহরণ বলছে সিপিএম দল অত্যন্ত গোঁড়া। ৯০ দশকের শেষ দিকে গোটা দেশে সাম্প্রদায়িকতা উত্থানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামতে সৈফুদ্দিনরা সওয়াল করেছিলেন তীব্র কংগ্রেস বিরোধিতা থেকে সরে এসে কংগ্রেসের সঙ্গে একটি নির্বাচনী জোট করতে। তিনি এবং অন্যান্যরা ব্যর্থ হয়েছিলেন। শোনা যায় দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ লবির ভয়ে অনেকেই তাঁদের সঙ্গে ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি করছিলেন। কিন্তু মাথা না নামিয়ে সৈফুদ্দিন, সমীররা তাঁদের দল 'পিডিএস' তৈরি করেছিলেন।
অথচ দেখা গেল শেষপর্যন্ত সিপিএম সৈফুদ্দিনদের পথেই হাঁটতে শুরু করল। দেশে বিজেপিকে ঠেকাতে কেন্দ্রীয় স্তরে তৈরি করা হল আইএনডিআইএ জোট। কিন্তু ততদিনে গঙ্গা দিয়ে অনেক জলই গড়িয়ে গিয়েছে। আজকের দিনে প্রতীক উর-এর যে যে বিষয় নিয়ে আপত্তি তুলেছেন তার মধ্যে একটি হল দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের সঙ্গে জনতা উন্নয়ন পার্টি'র কর্ণধার হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে সাক্ষাৎকার, ভবিষ্যতে দেখা যাবে হয়ত সিপিএম বলছে, বিষয়টি আমাদের 'ঐতিহাসিক ভুল' ছিল।
প্রতীক উর-এর অভিযোগ, দলে কোনও বিষয়ের সমালোচনা করায় তাঁকে কোনঠাসা করে দেওয়া হচ্ছে। স্পষ্টতই তাঁর আঙুল বর্তমান দলের রাজ্য সম্পাদকের দিকে। এমনকী একটি মিডিয়ায় প্রকাশিত তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে তিনি এটাও দাবি করেছেন আগের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র'র সময়ে তাঁকে এই পরিস্থিতিতে পরতে হয়নি। প্রতীক উর-এর শরীরী ভাষায় এটা স্পষ্ট, তিনি ঝাঁকের কই হতে না পারার জন্যই তাঁকে এই কোনঠাসা।
মনে রাখতে হবে এই মুহূর্তে সিপিএম কিন্তু রাজ্যে একটি ক্ষমতাসীন দল নয়। ক্ষমতায় থাকার সময় বহু লোক জুটে যায়। তাঁদের মধ্যে অনেকেই হাজির হন কলাটা, মূলোটার লোভে। কিন্তু কিছু পাওয়ার নেই অথচ দলের প্রতি অগাধ টান, এই মানসিকতা সম্পন্ন লোকগুলিই কিন্তু যে কোনো দলের সম্পদ। তা সে প্রতীক উর হোক বা যে কেউই হোক না কেন। পিডিএস নেত্রী অনুরাধা পুততুন্ডু'র কথায়, "সিপিএমে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো বিষয় নিয়ে যদি কেউ বিরোধী মতও প্রকাশ করেন তবে সেটাও গ্রাহ্য করতে হবে। সমস্যাটা হল এই নতুন শতাব্দীতে এসেও সিপিএম নিজেদের পাল্টায়নি। তাঁর মনোভাব জানতে চাওয়ার পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ 'গ্রুপ' তাঁকে কোনঠাসা করতে শুরু করে। এটা নিয়ে আমরা বহুবার বলেছিলাম। আমি মনে করি প্রতীক উর-এর মতো ছেলেরা সমাজকে অনেক কিছু দিতে পারে। এঁদেরকে যদি ঠিকঠাক ব্যবহার করা যায়, তাহলে এঁরা সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সম্পদ হতে পারেন।"
হতে তো পারে কিন্তু হওয়ায় কে বা কারা?
