আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘ কয়েক মাসের লড়াই। এর পর অবশেষে দুই দেশ যখন হাত মেলাল, তখন ভারতের আমজনতার নজর জ্বালানির দরের দিকেই। কারণ, এই যুদ্ধের জেরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে খনিজ তেলের যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। 

বিশ্ববাজারে তেলের জোগান কমায় লাফিয়ে বাড়ছিল দাম। বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছিল তীব্র মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা। তবে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে এই নতুন চুক্তি সই হওয়ার পর হরমুজ প্রণালী ফের খুলে দেওয়া হচ্ছে। আর তাতেই উল্টো রথ দেখছে আন্তর্জাতিক বাজার। হু হু করে নামছে অপরিশোধিত তেলের দর।

ভারত নিজের প্রয়োজনের প্রায় ৮৫ শতাংশেরও বেশি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে, এই যুদ্ধের আঁচ সরাসরি এসে পড়েছিল দেশের মধ্যবিত্তের পকেটে। হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধ চলায় জোগান বন্ধের ভয়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল।

বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবাহিত হয় এই সরু জলপথটি দিয়েই। ফলে ভারতে- পেট্রল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি, রান্নার গ্যাসের বাড়তি দাম, চড়া বিমানভাড়া এবং আকাশছোঁয়া পণ্য পরিবহণ খরচের আশঙ্কা ছিল। এক দিকে রাজকোষে টান, অন্য দিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার ভয়- জোড়া ফলায় পিষে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল দিল্লির।

আপাতত এই স্বস্তির চুক্তিতে হরমুজ প্রণালী ফের সচল করার পাশাপাশি ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা কমানোর বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। একই সঙ্গে স্থায়ী সমাধানের জন্য কথাবার্তাও জারি থাকবে।

আন্তর্জাতিক বাজার এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। এই আশাতেই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেল প্রতি ৭৭-৭৮ ডলারে নেমে এসেছে। গত তিন মাসের মধ্যে যা সবচেয়ে কম।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে ভারত প্রধানত তিনটি বড় সুবিধা পাবে।

প্রথমত, ভারতকে তেল কিনতে এখন অনেক কম টাকা খরচ করতে হবে। এতে দেশের রাজকোষের ওপর চাপ কমবে। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। খবর অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমায় ইতিমধ্যেই ভারতীয় শেয়ার বাজারে চাঙ্গা ভাব দেখা দিয়েছে। লগ্নিকারীরা মনে করছেন, জ্বালানির সস্তা দর দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে।

দ্বিতীয়ত, দেশের বাজারে পেট্রল-ডিজেলের দাম সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রোজ না বদলালেও, তেলের দাম যদি দীর্ঘদিন কম থাকে, তবে তেল সংস্থাগুলির কাছে দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। অন্ততপক্ষে আগামী দিনে দাম বাড়ার ভয় থাকে না।

তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালী শান্ত থাকলে পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতের তেল শোধনাগারগুলিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল চলে আসবে। ফলে জোগানে টান পড়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা কেটে যাবে।

এখন প্রশ্ন হল, ভারতের বাজারে কি এখনই সস্তা হবে জ্বালানি? উত্তর না। ভারতের বাজারে পেট্রল-ডিজেলের খুচরো দাম শুধুমাত্র অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তেল শোধনের খরচ, পরিবহণ ব্যয়, রাজ্য ও কেন্দ্রের ট্যাক্স এবং ডলারের তুলনায় টাকার দাম।

জানা গিয়েছে, আপাতত যে চুক্তিটি হয়েছে, তা সাময়িক। আগামী ৬০ দিনের জন্য দুই পক্ষ আলোচনা চালিয়ে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো একাধিক জটিল বিষয় এখনও মেটেনি।

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ সতর্ক করে জানিয়েছেন, যদি এই ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা ভেস্তে যায়, তবে তেলের দাম আবার বাড়তে পারে। 

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার তথা প্রধান আলোচক মহম্মদ বাঘের ঘালিবাফ স্পষ্ট জানিয়েছেন, “এই চুক্তি আসলে আমেরিকার ব্যর্থতা। ইতিহাস এর বিচার করবে। হরমুজ প্রণালী আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। এই জলপথের ওপর ইরানের পূর্ণ অধিকার রয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবেই আমরা আমাদের পরিষেবার জন্য ফি আদায় করব।”