আজকাল ওয়েবডেস্ক: শনিবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। রবিবার সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাস্তায় নেমে পড়েন প্রতিবাদীরা। শ্রীনগরের রাস্তায় আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর প্রতিবাদে স্লোগান ওঠে, “আল্লা হু আকবর, খামেনেই রেহবর (আল্লা মহান এবং খামেইনি নেতা)”। শোকার্তরা রাস্তায় নেমে, ছন্দে ছন্দে বুক চাপড়ে মিছিল করছিলেন। মিছিল থেকেই তীব্র শোক ও ক্ষোভের বর্ষণ হচ্ছিল। এতে আশুরার (মহরমের মিছিল) সমস্ত উপাদান ছিল। কিন্তু শিয়া মুসলিমদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা?
খামেনেইয়ের পুরো নাম ছিল আয়াতোল্লাহ সৈয়দ আলি হুসেইনি খামেনেই। তিনি হুসেইনি সৈয়দ বংশের প্রতিনিধি ছিলেন। হুসেইনি সৈয়দরা এবং তাদের বংশধারা প্রফেট মহম্মদের সঙ্গে সম্পর্কিত। আয়াতোল্লাহ শিয়া মুসলমানদেরও ইমাম ছিলেন। শিয়া পণ্ডিতরা বলছেন যে, তাঁর মৃত্যুতে তাঁরা তাঁদের নেতা, মারজা আল-তাকলিদ (অনুকরণের উৎস) এবং ওয়ালি আল ফকিহ (অভিভাবক আইনজ্ঞ)-কে হারিয়েছেন।
শোকাহতরা খামেনেইয়ের হত্যাকাণ্ড এবং কারবালার যুদ্ধে ইমাম হুসেনের হত্যার মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের দাবি, তেহরানে কারবালার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এক নারী বিক্ষোভকারী বলেন, “তিনি (খামেনেই) আমার কাছে আমার বাবা-মায়ের চেয়েও বেশি প্রিয়। এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁরা আমাদের ইমামকে শহিদ করেছে। তিনি ছিলেন ইসলামের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ।” তাঁর স্বামী আজাজ রিজভি তাঁর সঙ্গেই ছিলেন। তিনি বলেন, “শোক প্রকাশ করার মতো কোনও ভাষা তাঁর কাছে নেই। খামেনেইয়ের মৃত্যুবরণ করলেও, তাঁর ধারণাকে হত্যা করা যাবে না।”

আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুতে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ শ্রীনগরে। ছবি: সংগৃহীত।
খামেনেই ১৯৮০ সালে মাত্র একবার কাশ্মীর সফর করেছিলেন এবং শিয়া ও সুন্নি মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি শ্রীনগরের জামিয়া মসজিদে সুন্নিদের সঙ্গে নামাজ পাঠ করেছিলেন এবং সেখানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনির মৃত্যুর পর খামেনেই শিয়াদের সর্বোচ্চ নেতা এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারপর থেকেই শিয়া মুসলিমরা তাঁকে অনুসরণ করে আসছে। প্রকৃতপক্ষে, অনুসারিরা মারজা (নেতা) বা তার নির্বাচিত প্রতিনিধিকে খুমস (বার্ষিক সঞ্চয়ের প্রায় ২০% ধর্মীয় প্রাপ্য) প্রদান করে।

আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুতে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ লখনউয়ে। ছবি: সংগৃহীত।
এক শিয়া পণ্ডিত ব্যাখ্যা করেছেন যে খামেনেইকে ১২ ইমামের শেষ ইমাম মাহদির ভাইস-রিজেন্ট বলে মনে করা হয়। যিনি শেষ সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামকে উদ্ধার করার জন্য আবির্ভূত হবেন। তিনি বলেন, “তাঁর মৃত্যু কোনও নেতার সাধারণ মৃত্যু নয়, এটি আমাদের বিশ্বাসের বিষয়।”
শ্রীনগরের এমপি আগা রুহুল্লাহ মেহেদি বলেন, “খামেনেইয়ের মৃত্যুতে শোক ও ক্ষোভের নেপথ্যে কোনও একটি কারণ নেই। তিনি প্রতিরোধের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন এবং যারা ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণে নয়, প্রতিরোধে বিশ্বাস করতেন। গাজার বিষয়ে তাঁর অবস্থান একটি উদাহরণ। যারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের মাথা নত করেননি। তিনি গাজার জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য পরাধীনতার মুখোমুখি হওয়া মানুষের জন্য তিনিই ছিলেন একমাত্র আশার আলো।”
শিয়া মুসলিমদের ব্যক্তিগত জীবন গঠনে খামেনেইয়ের বিশাল ভূমিকা ছিল। ক্যাথলিকদের জন্য যেমন পোপ রয়েছেন। কিন্তু বিশ্বব্যাপী শিয়াদের কোনও একজন সর্বোচ্চ নেতা নেই। বেশিরভাগ শিয়া ইরাকের গ্র্যান্ড আয়াতোল্লাহ আলি সিস্তানি অথবা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইকে অনুসরণ করেন।
