আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকালীন উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ আক্রমণের পরে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন, ইরানের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতা আলি খামেইনি। তারপর ইরানের পালটা আঘাত। মধ্যপ্রাচ্যের থাকা আমেরিকার ঘাঁটিগুলি ছিল ইরানের লক্ষ্যকন্দ্র। 

এই জটিল পরিস্থিতিতে একটা প্রশ্ন উঠছে। ইরানের দুই ঘনিষ্ঠ শক্তি, রাশিয়া এবং চীন, কেন সরাসরি যুদ্ধে নামছে না? কড়া শব্দে নিন্দা দুই দেশই করছে। কিন্তু, তারা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করেনি এখনও। 

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভল্ডিমির পুতিনের কথায়, “এই হত্যাকান্ড মানবতার সমস্ত নীতিকে ভেঙে ফেলেছে।” পাশাপাশি উনি এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক সমস্ত আইনের নির্মম উলঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়াং ই, ইজরায়েলের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “শক্তি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না। উলটে এতে দীর্ঘমেয়াদে, সমস্যা তৈরি হয়।” 

রাশিয়া এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। এই মূহুর্তে রাশিয়া নতুন কোনও যুদ্ধে জড়াতে চায় না। দীর্ঘদিন ধরে এই যুদ্ধ চলছে। ফলে রাশিয়ার অনেক সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যয় হচ্ছে। এই অবস্থায় নতুন আর একটি যুদ্ধে জড়াতে চায় না। 

২০২৪ এ রাশিয়া ও ইরান একটা চুক্তি করে। সেই চুক্তির আওতায় গোয়ান্দে দিয়ে সহযোগিতা, প্রতিরক্ষায় সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সহযোগিতার উল্লেখ থাকলেও নেই, পারস্পরিক সামরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতা। অর্থাৎ, ইরান যুদ্ধ করলেই, রাশিয়াকেও যুদ্ধে অংশ নিতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। ইরানের সঙ্গে চুক্তি, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চুক্তির মতো অত শক্তিশালী নয় বলে রাশিয়ার বিশ্লেষক আন্দ্রেই কোরতুনভর দাবি। 

ক্রেমলিন সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ইরান রাশিয়ার কাছে সামরিক সহায়তা চায়নি। তিনি রাশিয়ার যুদ্ধে না নামার কারণ হিসাবে এই কারণটিকেও দেখিয়েছেন। 

অন্যদিকে চীন ইরানের দীর্ঘদিনের বন্ধু। ইরানে, চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগও আছে অনেক। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক দিক দিয়ে মিত্রতার সম্পর্ক বহুদিনের। তবুও, চীন সীমা টেনেছে। তাদের নীতি স্পষ্ট, সাধারণত তারা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের তথ্য সূত্র অনুসারে, বিশ্লেষক জোডি ওয়েন বলেন, “চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ঘনিষ্ট। কিন্তু চীন ইরানের সুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ করবে, তেমন সম্ভাবনা খুব কম।” 

এই যুদ্ধে আরও একটি বড় প্রভাব পড়েছে সমুদ্র কেন্দ্রিক বাণিজ্যে। ইরানের হুমকির কারণে হরমুক প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের একটা বড় অংশ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করে। তাই বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন যেহেতু মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল তেল আমদানি করে, তাই চীনের জ্বালানি সরবরাহেও চাপ পড়তে পারে। 

পাশাপাশি চীন আরেকটি বিষয়ও মাথায় রাখছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং এর সঙ্গে শীঘ্রই বৈঠক হওয়ার কথা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের। এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এমতাবস্থায় বিশ্লেষকদের মতে, চীন এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইবে না যাতে আমেরিকার সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়ে। বিশ্লেষকরা আরও জানান, চীন ইরানকে মূলত নিজেরদের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে। ইরানকে নিজেদের সামরিক বন্ধু হিসেবে মনে করে না। পাশাপাশি উপসাগরীয় অন্যান্য দেশ যেমন সৌদি আরব বা আরব আমিরাতের মতো দেশের সঙ্গেও চীনের বন্ধুত্ব আছে। সেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চীন নষ্ট করতে চায় না। সূত্রের দাবি সেটাই। 

রাশিয়া ও চীন দুই দেশই যুদ্ধের নিন্দা করেছে, জাতিসংঘে বৈঠক ডেকেছে, এমনকি ইরানের পাশে কূটনৈতিক সহাবস্থানে দাঁড়িয়ে তারা রাজনৈতিক সমর্থনও দিয়েছে। কিন্তু তারা সরাসরি যুদ্ধে নামেনি। মস্কো ও বেইজিং সতর্কতা মূলক দূরত্ব বজায় রাখছে।