আজকাল ওয়েবডেস্ক: আমেরিকা-ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধ কোনও স্পষ্ট সমাধান ছাড়াই তৃতীয় সপ্তাহে পড়েছে। পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাত সামলাতে বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা ভারতকে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উল্লেখ করছেন। যদিও নয়াদিল্লি এখনও এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার প্রস্তাব দেয়নি। তবে, কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের বিশ্বাস, সব পক্ষকে এক টেবিলে আনার বিরল ক্ষমতা ভারতের রয়েছে। সম্প্রতি ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব ব্লুমবার্গকে বলেছেন, “আমাদের যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। আমি ভাবছি ভারত আদৌ এতে নিজেকে জড়াবে কি না। আমরা দেখেছি বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।” সকলেই মনে করছেন, উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তার জন্য ভারত অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলার বিরল ক্ষমতা
এই ধারণার অন্যতম প্রধান কারণ, সংঘাতের তিনটি প্রধান পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষমতা ভারতের। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নয়াদিল্লি ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। একই সঙ্গে, এটি ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আমেরিকার সঙ্গেও অংশীদারিত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং কৌশলগত সহযোগিতার মতো ক্ষেত্রগুলিতে। এই ভারসাম্যের কারণেই ভারত সংঘাত শুরু হওয়ার পরেও সব পক্ষের সঙ্গে নিরপেক্ষ থাকতে পেরেছে।
এক সাক্ষাৎকারে কর্নেল ডগলাস ম্যাকগ্রেগর যুক্তি দিয়েছেন যে, ভারতের নিরপেক্ষতা তাকে বাড়তি সুবিধা দেয়। তিনি বলেন, “আমেরিকা-ইজরায়েল-ইরান যুদ্ধ থামাতে আমাদের একজন মধ্যস্থতাকারী প্রয়োজন, এবং তিনি হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।” তিনি আরও বলেন, “ইরান ও ইজরায়েলের সঙ্গে মোদির সুসম্পর্ক রয়েছে। ভারত এই যুদ্ধে কোনওভাবেই জড়িত নয়। ভারত একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং একমাত্র নিরপেক্ষ রাষ্ট্র যা মর্যাদা, শক্তি ও প্রভাবে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
একইভাবে, ভারতে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত হুসেন হাসান মির্জা ইন্ডিয়া টুডে টিভিকে বলেছেন, “ভারত একটি মহান দেশ। ভারতের যে মর্যাদা, তাতে মোদির পক্ষ থেকে ইজরায়েল ও ইরান উভয়কেই থামানোর জন্য একটিমাত্র ফোন কলই যথেষ্ট, এবং তা থেমে যাবে। মাত্র একটি ফোন কলেই।”
অর্থনৈতিক উত্থান কূটনৈতিক গুরুত্বকে শক্তিশালী করছে
ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি বিশ্বে প্রভাব বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা সত্ত্বেও ভারত বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডার (আইএমএফ)-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক ২০২৬’ অনুযায়ী, এ বছর বিশ্বের প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধিতে ভারতের অবদান প্রায় ১৭ শতাংশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রসারিত করেছে এবং একাধিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা বিভিন্ন অঞ্চলে একটি প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হিসাবে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
দ্য ইকোনমিস্ট ভারতের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার কথা উল্লেখ করে বলেছে, “দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি আশ্চর্যজনকভাবে স্থিতিশীল। এই বছর দেশটি একদিকে যেমন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের শিকার হয়েছে, রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে বিশেষভাবে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তেমনই পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সশস্ত্র যুদ্ধেও অংশ নিয়েছে। এর অর্থনীতি এসব প্রায় টেরই পায়নি।” এই ধরনের স্থিতিশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অংশ নিতে সক্ষম একটি দেশ হিসেবে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলেছে।
স্বায়ত্তশাসন এবং বিশ্বাসযোগ্যতা
ভারতের বিদেশনীতি দীর্ঘকাল ধরে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি নয়াদিল্লিকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি ভারতকে প্রায়শই বিরোধী পক্ষে থাকা দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত আমেরিকা, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোয়াড জোটের অংশ হিসেবে থাকার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্কও বজায় রেখেছে। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, এই নমনীয়তা ভারতকে পক্ষপাতদুষ্ট না দেখিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরান উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে সাহায্য করে।
মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও, ইরানের সঙ্গে ব্যাপক জ্বালানি সম্পর্ক এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ সরবরাহে ভূমিকার কারণে চীনকে নিরপেক্ষ বলে মনে করা হয় না। সাধারণত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে আসা উপসাগরীয় দেশগুলিও এই সংঘাতের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলি আমেররিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকায়, নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা সীমিত। পরে থাকছে শুধু ভারতই। যদিও নয়াদিল্লি এখন পর্যন্ত মধ্যস্থতা করার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। তবে চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করুক বা না করুক, ভারতকে একটি বিশ্বাসযোগ্য শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
