আজকাল ওয়েবডেস্ক: তালিবান-শাসিত আফগানিস্তানে সদ্য জারি হওয়া নতুন “ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোড ফর কোর্টস” দেশটির বিচারব্যবস্থাকে আরও অন্ধকার এক অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দিল এমনটাই মনে করছেন মানবাধিকার সংগঠন, প্রাক্তন সরকারি আধিকারিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা। ১১৯ ধারার এই নথি শুধু বিচারপ্রক্রিয়ার দিকনির্দেশই দেয় না, বরং আইনের মধ্যেই বৈষম্য, সহিংসতা ও দাসত্বকে বৈধতা দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই নতুন কোডে আফগান সমাজকে চারটি অসম শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে- ধর্মীয় আলেম বা মোল্লারা সর্বোচ্চ স্থানে, তার পরে অভিজাত বা আশরাফ শ্রেণি, এরপর মধ্যবিত্ত এবং সর্বনিম্নে নিম্নবর্গ। মানবাধিকার সংগঠন রাওয়াদারির দাবি অনুযায়ী, অপরাধের শাস্তি এখন আর অপরাধের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করছে না, বরং অপরাধীর সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, কোনও  ধর্মীয় আলেম অপরাধ করলে তাঁকে কেবল ‘উপদেশ’ দেওয়া হবে। অভিজাতদের ক্ষেত্রে ‘সমন ও উপদেশ’, মধ্যবিত্তদের জন্য কারাদণ্ড, আর নিম্নবর্গের মানুষদের জন্য কারাদণ্ডের পাশাপাশি শারীরিক শাস্তি- এটাই নতুন আইনের কাঠামো।

এই শ্রেণিবিন্যাসকে অনেকেই ভারতের বর্ণব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ব্যবহারকারী একে “দেওবন্দি ইসলামিক চতুর্বর্ণ প্রথা” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তালিবান-বিরোধী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (NRF) জানিয়েছে, এই আইন কার্যত “সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে রায় দেওয়ার” আইনি স্বীকৃতি। NRF নেতা আহমদ মাসুদের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী একে ভারতের ব্রাহ্মণ-শূদ্র ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে বলেছে, “উচ্চশ্রেণি সুরক্ষিত থাকবে, দরিদ্ররা শাস্তি পাবে।”

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এই কোডে ‘গোলাম’ (দাস) শব্দের একাধিকবার ব্যবহার। এতে দাসত্বকে একটি স্বীকৃত আইনি শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইনের ১৫ নম্বর ধারা বলছে, যেসব অপরাধে নির্দিষ্ট ‘হুদুদ’ শাস্তি নেই, সেখানে ‘তাজির’ বা বিচারকের বিবেচনাভিত্তিক শাস্তি দেওয়া হবে অপরাধী স্বাধীন হোক বা দাস হোক। আরও ভয়াবহ হলো, তাজির শাস্তি প্রয়োগ করতে পারবেন স্বামী বা প্রভু (মাস্টার)। মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন, যেখানে দাসত্ব নিষিদ্ধ এবং মানবাধিকারের একটি অখণ্ড নীতি হিসেবে বিবেচিত।

আইনটি নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক সহিংসতাকে নিষিদ্ধ করেছে, যেমন হাড় ভাঙা বা চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ার মতো আঘাত। কিন্তু এর বাইরে “শাসনের” নামে সহিংসতা কার্যত বৈধ। লন্ডনভিত্তিক আফগান সংবাদমাধ্যম আফগান ইন্টারন্যাশনাল জানাচ্ছে, এই আইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনও  বাবা তাঁর ১০ বছরের ছেলেকে নামাজে অবহেলার জন্য শাস্তি দিতে পারেন।

এই নতুন কোড তালিবানদের দীর্ঘদিনের নিষ্ঠুর বিচারচর্চাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। আগে হিংসা ছিল তালিবানি শাসনের একটি বাস্তবতা, এখন তা আদালত ও আইনের মাধ্যমে বৈধতা পাচ্ছে। তালিবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা এই আইন অনুমোদন করেছেন এবং তা প্রাদেশিক আদালতগুলিতে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি পূর্ব আফগানিস্তানের খোস্ত প্রদেশে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ঘটনার কথা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ১৩ বছরের এক কিশোরকে দিয়ে প্রকাশ্যে এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করানো হয়, যে ব্যক্তি একই পরিবারের ১৩ জনকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল। প্রায় ৮০ হাজার মানুষ সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে। ২০২১ সালে তালিবান ক্ষমতায় ফেরার পর এটি ছিল একাদশ বিচারবিভাগীয়  হত্যাকাণ্ড। জাতিসংঘের বিশেষ দূত এই ঘটনাকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেন।

আফগানিস্তানের প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল মহম্মদ ফারিদ হামিদি এই আইনকে “সব নাগরিকের দণ্ডাদেশ ঘোষণা করা একটি নথি” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, মানুষকে সামাজিকভাবে নিকৃষ্ট বলে চিহ্নিত করা মানব মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধান রহমানুল্লাহ নাবিল বলেছেন, এটি প্রমাণ করে যে “রাজনীতিকৃত ধর্ম ও কঠোর ব্যাখ্যা আফগানিস্তানের কোনও  ভবিষ্যৎ দিতে পারে না।”

নারী ও শিশুদের জন্য এই আইন আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা। আফগান উইমেনস জাস্টিস মুভমেন্ট একে “নিষ্ঠুরতার আইনি রূপ” বলে বর্ণনা করেছে। এরই মধ্যে তালিবান মহিলাদের লেখা ১৪০টি বই নিষিদ্ধ করেছে, বহু বিষয় পড়ানো বন্ধ করেছে এবং দুর্যোগের সময়েও মহিলাদের উদ্ধার কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষ দূত রিচার্ড বেনেট এই কোডের “গভীরভাবে উদ্বেগজনক” দিকগুলি পর্যালোচনা করছেন বলে জানিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন রাওয়াদারি এর অবিলম্বে কার্যকরকরণ বন্ধ এবং বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তারা জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থাগুলির হস্তক্ষেপ চেয়েছে।

সব মিলিয়ে, তালিবানের এই নতুন আইন আফগানিস্তানে বৈষম্য, ভয় এবং হিংসাকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ করে তুলছে। সমতা ও মানব মর্যাদার মৌলিক ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই বিচারব্যবস্থা এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে যেখানে শাসনের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে দমন, শাস্তি ও আতঙ্ক।