আজকাল ওয়েবডেস্ক: পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে সন্ত্রাস-প্রভাবিত দেশে পরিণত হয়েছে। একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তথ্য দিয়েছে টগ্লোবাল টেররিজম টয়েররিজম ইন্ডেক্স ২০২৬’ বা জিটিআই। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে মোট ১,১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মোট ১,০৪৫টি সন্ত্রাসী আক্রমণ হয়েছে। এই আক্রমণগুলিতে সব মিলিয়ে ১,৫৯৫ জন আহত হয়েছেন। ৬৫৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
রিপোর্টে পাকিস্তানের স্কোর ৮.৫৭৪। বছরে কত সন্ত্রাস আক্রমণ হয়েছে, কতজন আহত হয়েছে বা নিহত হয়েছে ইত্যাদির পরিমাপকে একত্রে একটি স্কোর তৈরি করা হয়। সেই স্কোরে পাকিস্তান তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে। এটি ২০১৩ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ বছর। একটানা ছয় বছর ধরে সন্ত্রাসে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলিতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আক্রমণ হয়েছে দু’টি প্রদেশে। একটি হল খাইবার পাখতুনখোয়া এবং অন্যটি বালুচিস্তান। এই দুই প্রদেশে সব মিলিয়ে মোট ৭৪ শতাংশ আক্রমণ হয়েছে। ৬৭ শতাংশ মৃত্যুর হার দেখা গিয়েছে। সবচেয়ে সক্রিয় সন্ত্রাসী সংগঠন হল তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান বা টিটিপি। ২০২৫ সালে টিটিপি মোট ৫৯৫টি হামলা করেছে। এই আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে মোট ৬৩৭ জনের। মোট মৃত্যুর ৫৬ শতাংশের জন্য দায়ী এই সংগঠন। লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে করে হত্যার ঘটনা ৪৫০ শতাংশ বেড়েছে। পুলিশের মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। টিটিপি এখন আক্রমণের জন্য ড্রোন ব্যবহার করছে। এই ড্রোনের ব্যাবহার তাদের আক্রমণের কৌশলগত দিক থেকে এক বড় পরিবর্তন।
রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৬,০০০ থেকে ৬,৫০০ জঙ্গি বর্তমানে আফগানিস্তানে অবস্থান করছে। সেখান থেকেই তারা আক্রমণ করছে। ৮৫ শতাংশ আক্রমন হয়েছে আফগান সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায়। ১০ থেকে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে সীমান্ত অঞ্চলের ভূগোল খুব গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের উপজাতীয় এলাকা বহু বছর ধরে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত ছিল না। এটি ছিল জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয়। এখানে সক্রিয় ছিল তালিবান, হাক্কানি নেটওয়ার্ক, আল-কায়েদা। পরে টিটিপিও এখানে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ডুরান্ড লাইনের দুই পাশে পশতুন জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি আছে। এর ফলে জঙ্গিদের যাতায়াত সহজ হয়েছে। পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলি, বিশেষ করে শরণার্থী শিবিরে, অনেক জঙ্গি-মতাদর্শ গড়ে উঠেছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালিবান ক্ষমতায় ফিরে আসে। তালিবান ক্ষমতায় আসার পর টিটিপি একটি নিরাপদ আশ্রয় পায়।পাকিস্তান আফগান সরকারকে টিটিপি নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছে। কিন্তু তালিবান তা মানেনি।
১৯৯০-এর দশকে পাকিস্তান ‘ভাল তালিবান’ ও ‘খারাপ তালিবান’ আলাদাভাবে বিচার করা হত। ‘ভাল তালিবান’ ব্যবহার করা হত বিদেশনীতি ও কৌশলগত দিক দিয়ে। ‘খারাপ তালিবান’ ছিল যারা দেশের ভিতরে আক্রমণ চালাত তারা। তবে এখন এই বিভাজন আর কাজ করছে না। ২০২৫-এর মার্চে একটি বড় আক্রমণ হয়। বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি একটি যাত্রীবাহী ট্রেন দখল করে। সেই আক্রমণের সঙ্গে যুক্তদের মধ্যে ৪৪২ জনকে আটক করা হয়। এই আক্রমণ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলাগুলির একটি। বিএলএ আগে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করত। এখন তাদের কার্যকলাপ রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসে রূপ নিয়েছে। তাদের টার্গেট এখন পাকিস্তানের সেনা, চীনা নাগরিক,সিপিইসি প্রকল্প।
রিপোর্ট বলছে, বালুচিস্তানে দীর্ঘদিন সামরিক শাসন ছিল। রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। এই কারণে সংগঠিত হিংসা বাড়ছে। রিপোর্টে কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন সীমান্তে আশ্রয় দেওয়া, জঙ্গিদের চলাচলের সুযোগ, রাষ্ট্র-সমর্থিত সন্ত্রাস থেকে স্বনির্ভর সন্ত্রাসে রূপান্তর। এই বিষয়গুলি ভারতের দীর্ঘদিনের অভিযোগের সঙ্গে মিলে যায়। ভারত বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই বিষয়গুলি তুলে ধরছে। রিপোর্টে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়েও বলা হয়েছে। পহেলগাঁওয়ের জঙ্গি হামলার পর দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। এর জবাবে ভারত অপারেশন সিঁদুর চালায়। রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটি বহু বছরের নীতির ফল। বিভিন্ন সরকার ও সামরিক শাসনের সিদ্ধান্ত এর জন্য দায়ী।
২০১৩ সালেও বড় সঙ্কট হয়েছিল। তখন সামরিক অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল। কিন্তু এখন টানা ছয় বছর ধরে পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে পুরনো কৌশল আর কাজ করছে না। এই রিপোর্ট পাকিস্তানের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে উঠে এসেছে। সন্ত্রাস এখন শুধু নীতি নয়, দেশের অভ্যন্তরে এক বড় সঙ্কটে পরিণত হয়েছে।
