আজকাল ওযেবডেস্ক: যা ভারতে অতি তুচ্ছ, তা ব্রিটেনে অতি বড় অপরাধ। কিন্তু, সেদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের এসবে যেন কিছু যায়, আসে না। লন্ডনে একটি 'স্টিং অপারেশন' (গোপন অনুসন্ধান) এক উদ্বেগজনক প্রথার পর্দা ফাঁস করেছে। যেখানে লন্ডন বা ব্রিটেনে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত বাড়ির মালিকরা, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর জন্য বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। প্রকাশিত বিজ্ঞাপনগুলোতে "শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য" এবং "শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য" - এমন ট্যাগ বা নির্দেশিকা যুক্ত ছিল।

ব্রিটেন-ভিত্তিক দৈনিক পত্রিকা 'দ্য টেলিগ্রাফ'-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেসবুক, গামট্রি এবং টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাড়ি ভাড়ার জন্য প্রকাশিত বিজ্ঞাপনগুলোতে প্রকাশ্যে এমন সব বাক্যাংশ ব্যবহার করা হচ্ছিল (যেমন- "শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য", "দুজন মুসলিম ছেলে বা দুজন মুসলিম মেয়ের জন্য", এবং "মুসলিমদের অগ্রাধিকার") যা ব্রিটেনে 'সমতা আইন ২০১০'-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

কিছু বিজ্ঞাপন আবার নির্দিষ্ট আঞ্চলিক বা ভাষাগত গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছিল। যেখানে পাঞ্জাবি ও গুজরাটি ভাষাভাষী কিংবা কেরল ও হরিয়ানা অঞ্চলের মানুষদের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

'রোশন প্রপার্টিজ' নামের একটি সংস্থা (যারা টিকটক-এও সক্রিয়) একাধিক বিজ্ঞাপন পোস্ট করেছিল। 'দ্য টেলিগ্রাফ'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই বিজ্ঞাপনগুলোতে লেখা ছিল "মুসলিম ছেলেকে অগ্রাধিকার", "মুসলিমদের জন্য একটি ডাবল রুম খালি আছে", এবং "পাঞ্জাবি ছেলেদের জন্য উপযুক্ত"। 'দ্য টেলিগ্রাফ' এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার পরপরই সংস্থাটির ফেসবুক পেজটি সরিয়ে ফেলা হয়।

'দ্য টেলিগ্রাফ'-এর একজন প্রতিবেদক  ভারতীয় বংশোদ্ভূত এমন একজন বাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি মাসে ৪৫০ পাউন্ড ভাড়ায় তাঁর বাড়ির একটি রুমের বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। সেই বিজ্ঞাপনে উল্লেখ ছিল যে, রুমটি "মুসলিম ছেলে বা মেয়ের জন্য"। ওই বাড়ির মালিক  অ-মুসলিম ভাড়াটিয়াদের বিষয়টি বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফোন কেটে দেন।

এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন সব বিজ্ঞাপনের কথাও উঠে এসেছে যেখানে স্পষ্টভাবে "শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য" উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সম্ভাব্য ভাড়াটিয়াদের কেউ কেউ আবার নিজেরাও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে থাকার জায়গা খুঁজছিলেন।

এই ধরনের সমস্ত বিজ্ঞাপন ব্রিটেনের 'সমতা আইন ২০১০'-এর লঙ্ঘন। এই আইন- ধর্ম, জাতি এবং অন্যান্য সুরক্ষিত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে যেকোনও ধরনের বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করে। 'দ্য টেলিগ্রাফ'-এর তথ্যমতে, বাড়ির মালিক এবং ভাড়াটিয়া ব্যবস্থাপকদের  কোনও সম্পত্তি ভাড়া দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট কোনও ধর্ম বা জাতির প্রতি অগ্রাধিকার দেখানোর অনুমতি নেই এবং "শুধুমাত্র মুসলিমদের জন্য" - এমন বাক্যাংশ যুক্ত করাকে "অগ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যমূলক" হিসেবে গণ্য করা হয়।

তবে, এই আইনের আওতায় একটি সীমিত ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। কোনও ব্যক্তি যদি নিজের বাড়িতেই একটি রুম ভাড়া দেন এবং ভাড়াটিয়ার সঙ্গে রান্নাঘর বা বাথরুমের মতো সুযোগ-সুবিধাগুলো ভাগ করে নেন, তবে তিনি খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত পছন্দের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, রান্নাঘরে মাংস রান্না এড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি শুধুমাত্র নিরামিষভোজী ভাড়াটিয়া নেওয়ার শর্ত দিতে পারেন।

ব্রিটেন ভিত্তিক অনলাইন শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন ও কমিউনিটি ওয়েবসাইট 'গামট্রি'-র একজন মুখপাত্র 'দ্য টেলিগ্রাফ'-কে বলেন, "গামট্রি-র সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে, যা যেকোনও ধরনের বেআইনি বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করে। আমরা অনুপযুক্ত বা আপত্তিকর বিজ্ঞাপনের বিষয়ে প্রাপ্ত অভিযোগগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি।" মুখপাত্র আরও জানান যে, কিছু বিজ্ঞাপন হয়তো 'শেয়ারড অ্যাকোমোডেশন' বা যৌথ আবাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এক্ষেত্রে, "বর্তমান বাসিন্দারা তাদের সহবাসী হিসেবে কাদের চান, সে বিষয়ে নিজেদের পছন্দের কথা প্রকাশ করতে পারেন।" পুরো একটি বাড়ি বা সম্পত্তি ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি থেকে এই ধরনের আবাসনের বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হয়।

গামট্রি-এর মুখপাত্র বলেন, "আমরা আশা করি, আমাদের সকল ব্যবহারকারী দায়িত্বের সঙ্গে এবং সবার প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে বিজ্ঞাপন প্রচার করবেন।"

লন্ডনের বিভিন্ন অংশে (যার মধ্যে ইলফোর্ড, নিউহ্যাম, বার্কিং, ড্যাগেনহাম, ইস্ট হ্যাম, রেডব্রিজ, ওয়ালথামস্টো, আপটন পার্ক, হ্যারো এবং নিউবেরি পার্ক অন্যতম) এই বিজ্ঞাপনগুলোর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।

'দ্য টেলিগ্রাফ' পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, 'রিফর্ম ইউকে' রাজনৈতিক দলের অর্থনৈতিক মুখপাত্র রবার্ট জেনরিক এ প্রসঙ্গে বলেন, "এই বিজ্ঞাপনগুলো অত্যন্ত জঘন্য এবং ব্রিটিশ মূল্যবোধের পরিপন্থী। এ কথা বলাই বাহুল্য যে, পরিস্থিতি যদি উল্টো হত অর্থাৎ অন্য কোনও গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এমনটি ঘটত, তবে সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠত। সব ধরনের বর্ণবাদই অগ্রহণযোগ্য, কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীরই এভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ করার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনও ছাড় বা ব্যতিক্রমী সুবিধা পাওয়া উচিত নয়।"