আজকাল ওয়েবডেস্ক: সাধারণত একটা বেলার খাবার শেষ করতে গিয়েই আমাদের কালঘাম ছুটে যায়। কিন্তু মিশেল লোটিটোর খিদের গল্পটা ছিল একেবারেই আলাদা। ফ্রান্সের এই মানুষটিকে দুনিয়া চিনত “মঁসিয়ে মাঁজেতু” বা “সবখেকো বাবু” নামে। সাইকেল, শপিং ট্রলি, টেলিভিশন, ঝাড়বাতি থেকে শুরু করে আস্ত কফিন—মানুষের পক্ষে হজম করা অসম্ভব এমন সব জিনিস অনায়াসে খেয়ে সাবাড় করে দিতেন তিনি। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে তাজ্জব করা কীর্তি ছিল একটা আস্ত উড়োজাহাজ খেয়ে ফেলা।
১৯৫০ সালে ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া লোটিটো কিশোর বয়সেই বুঝতে পারেন যে কাঁচ বা ধাতুর মতো জিনিস খেলেও তাঁর শরীরের কোনও ক্ষতি হচ্ছে না। পরে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখেন, তাঁর পাকস্থলী এবং অন্ত্রের দেওয়াল সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি মোটা। আর এই বিশেষ শারীরিক গঠনের কারণেই ধারালো জিনিসও তাঁর শরীরের ভেতরে কোনও ক্ষত তৈরি করতে পারত না।
নিজের এই অদ্ভুত ক্ষমতাকেই পেশা বানিয়ে নিয়েছিলেন লোটিটো। তিনি বড় বড় ধাতব জিনিসকে প্রথমে কেটে কুচিকুচি করতেন, তারপর সেগুলোকে আরও ছোট টুকরোয় ভেঙে গিলে নিতেন। এই ধাতুর টুকরোগুলো যাতে পেটের ভেতর দিয়ে সহজে নেমে যেতে পারে, তার জন্য তিনি প্রচুর জল আর মিনারেল অয়েল বা খনিজ তেল খেতেন। ১৯৭৮ সালে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি নেন—একটি আস্ত সেসনা ১৫০ বিমান খাওয়ার সিদ্ধান্ত।
অবশ্য কোনও সস্তা প্রচারের জন্য একবারে বসে তিনি এই কাজ করেননি। আস্ত বিমানটিকে প্রথমে হাজার হাজার টুকরো করা হয়। এরপর টানা প্রায় দু-বছর ধরে একটু একটু করে সেই বিমানটির লোহা, রবার ও প্লাস্টিকের যন্ত্রাংশ চিবিয়ে খান তিনি। ১৯৮০ সালের মধ্যে গোটা বিমানটি আক্ষরিক অর্থেই তাঁর পেটে চলে যায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, এই অবিশ্বাস্য কাণ্ডের পরও তাঁর শরীরে কোনও বড় রোগ বা সমস্যা দেখা দেয়নি।
বিজ্ঞানীদের কাছে লোটিটোর এই অবস্থাটি ছিল এক পরম বিস্ময়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'পাইকা' (pica)—এটি এমন এক মানসিক ও শারীরিক অবস্থা যেখানে মানুষের খাবার নয় এমন জিনিসের প্রতি তীব্র আসক্তি তৈরি হয়। তবে লোটিটোর ঘটনাটি ছিল একেবারেই অনন্য, কারণ যেসব জিনিস খেলে যে কেউ মারা যেতে পারে, তিনি সেগুলো অনায়াসে হজম করে ফেলতেন।
হিসেব করে দেখা গেছে, নিজের গোটা জীবনে প্রায় নয় টন ধাতু খেয়েছিলেন লোটিটো। এই অদ্ভুত খাবারের অভ্যাসের কারণেই গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে তাঁর নাম ওঠে এবং বিশ্বজুড়ে তিনি খ্যাতি পান। ২০০৭ সালে ৫৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান, তবে তাঁর মৃত্যু কিন্তু এই খাদ্যাভ্যাসের কারণে হয়নি। আজ এত বছর পরেও মিশেল লোটিটো ইতিহাসের অন্যতম এক অদ্ভুত পারফর্মার হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন—যিনি অসম্ভবকে নিজের পেশা বানিয়ে দেখিয়েছিলেন যে পরিস্থিতি বিশেষে একটা আস্ত বিমানও রাতের খাবার হয়ে উঠতে পারে।
















