আজকাল ওয়েবডেস্ক: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইজরায়েল যৌথ হামলায় নিহত হন সেদেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তারপর ৯ মার্চ ওই কুর্সিতে বসানো হয়েছে আয়াতোল্লারই ছেলে মোজতাবাকে। ১২ মার্চ মোজতাবা খামেনেই-এর প্রথম জন-বিবৃতি এবং ২০ মার্চ নওরোজ উপলক্ষে দেওয়া তাঁর বার্তা, রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমের মাধ্যমে পাঠ করে শোনানো হয়। তবে, তিনি এখনও জনসমক্ষে আসেননি। যা নিয়েই জল্পনার পারদ চড়ছে। 

ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা জীবিত আছেন ঠিকই, কিন্তু দেশের ওপর তাঁর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নেই। বিভিন্ন সূত্র 'জেরুজালেম পোস্ট'-কে জানিয়েছে যে, ইরানের প্রকৃত ক্ষমতা সম্ভবত 'ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস' (আইআরজিসি)-এর হাতেই চলে গিয়েছে। মোজতাবা দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর নিজের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারেননি।

'জেরুজালেম পোস্ট' মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের গোয়েন্দা সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে, ২৮ ফেব্রুয়ারির যে বিমান হামলায় আলি খামেনেই নিহত হয়েছিলেন, তাতেই জখম হয়েছেন মোজতাবা। তা সত্ত্বেও অন্তত কিছু দায়িত্ব পালনের মতো শারীরিক সক্ষমতা তাঁর এখনও রয়েছে।

'অ্যাক্সিওস'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেছেন, "আমরা মনে করি না যে, ইরানিরা একজন মৃত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করার জন্য এতসব ঝক্কি-ঝামেলা পোহাত। তবে একই সঙ্গে, তিনি যে বর্তমানে দেশের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন - এমন কোনও প্রমাণও আমাদের কাছে নেই।"

'অ্যাক্সিওস'-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোজতাবা এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়মিত গোয়েন্দা ব্রিফিংগুলোতে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই প্রতিবেদনে এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে আরও বলা হয়েছে যে, তেহরানে বর্তমানে প্রকৃতপক্ষে কে বা কারা ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছেন - তা নিয়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক দলটি এখনও বিশদ পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন চালিয়ে যাচ্ছে।

তেল আবিব-এর 'ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ'-এর ইরান বিশেষজ্ঞ রাজ জিম্মত 'অ্যাক্সিওস'-কে জানিয়েছেন যে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে নতুন সর্বোচ্চ নেতার জনসমক্ষে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সংবাদ মাধ্যমকে জিম্মত বলেন, "তাঁর (মোজতাবা খামেনেই) আঘাত এতটাই গুরুতর যে, নিজের শারীরিক অবস্থার ভয়াবহতা যাতে সাধারণ মানুষের সামনে উন্মুক্ত হয়ে না পড়ে - সেজন্য তিনি এমনকী কোনও পূর্ব-রেকর্ডকৃত ভিডিও বার্তা প্রকাশ করার মতো অবস্থাতেও নেই।"

১২ মার্চ সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেওয়া তাঁর প্রথম জন-বিবৃতিতে একজন টিভি সংবাদ উপস্থাপক পাঠ করে শোনান। সেখানে মোজতাবা খামেনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এবং 'হরমুজ প্রণালী' ইস্যুতে তেহরানের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেছিলেন। উল্লেখ্য, সে সময় উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের আরও জটিল হচ্ছিল। মোজতাবা এও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইরান তার শহিদদের রক্তের প্রতিশোধ নেবে এবং হরমুজ প্রণালীকে অবরুদ্ধ করে রাখবে। ২০শে মার্চ, পারস্য নববর্ষের দিনে, ইরানের নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমের কাছে প্রকাশিত আরেকটি লিখিত বিবৃতিতে ইরানি জনগণের অটল দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। একই দিনে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম মোজতাবার একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে তাঁকে একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ম-শিক্ষা দিতে দেখা যায়। তবে এই ভিডিও-তে কোনও তারিখের উল্লেখ ছিল না।

জনসমক্ষ থেকে মোজতাবার এই অনুপস্থিতির বিষয়টি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন 

ইজরায়েল ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের একের পর এক খতম করছে। ইরানের নিরাপত্তা কৌশল পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত আলি লারিজানিচলমান সংঘাতের মাঝে তেহরানের প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৭ই মার্চ ইসরায়েলি হামলায় লারাজানি নিহত হন। ১৬ই মার্চ ইজরায়েলি বিমান হামলায় গোলামরেজা সোলেইমানি নামের আরেক শীর্ষ কমান্ডারও প্রাণ হারান। এই সময়ে মোজতাবার অবস্থান ঘিরে ধোঁয়াশা মার্কিন ও ইজরায়েলিদের কাছে বেশ বিভ্রান্তিকর।

তবে, ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি 'আল জাজিরা'কে জানিয়েছেন যে, নিজেদের অনেক শীর্ষ নেতাকে হারানোর পরেও তেহরান তার লড়াই চালিয়ে যাবে। কাতারি এই সংবাদমাধ্যমকে আরাঘচি বলেন, "একজন মাত্র ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি ইরানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর কোনও প্রভাব ফেলে না।"

২৮শে ফেব্রুয়ারি আলি খামেনেই-র মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে তুলনা টেনে আরাঘচি বলেন, "(সর্বোচ্চ) নেতা নিজেও শাহাদাত বরণ করেছিলেন, তবুও দেশের শাসনব্যবস্থা তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছিল।"

২৮শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম নিহতের সংখ্যা ১,২৭০ জন বলে উল্লেখ করেছে। ইরানের ওপর ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে, তেহরান মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়ে সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

ইতিমধ্যেই ইরান জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়া এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে অতিক্রমকারী জাহাজগুলোর ওপর হামলার হুমকিও দিয়েছে। ইরানের হামলার আশঙ্কায় অধিকাংশ জাহাজই এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করা এড়িয়ে গিয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে, বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ এক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা মাথাচাড়া দিয়েছে।