আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আপস করার দরজা খুলেছে। তেহরান জানিয়েছে যে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তির জন্য প্রস্তুত, তবেএই আপস তখনই সম্ভব যখন ওয়াশিংটন ইরানের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে। বিবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী মাজিদ তখত-রাভানচি বলেছেন যে, "ইরান চুক্তিতে আগ্রহী, বল এবার আমেরিকার কোর্টে। তাদেরও প্রমাণ করতে হবে যে তারা চুক্তিতে রাজি। যদি ওয়াশিংটন আন্তরিক হয়, আমি নিশ্চিত আমরা চুক্তির পথে থাকব।" তিনি আরও বলেন যে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি যুক্তিপূর্ণভাবে আলোচনা হলে তেহরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা নিয়ে সংলাপে ইচ্ছুক।

যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা যুক্তি দিয়ে চলেছেন যে, ইরান দীর্ঘমেয়াদী আলোচনায় অগ্রগতি বিলম্বিত করছে। শনিবার, মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও বলেছেন যে, রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চুক্তি পছন্দ করেন তবে ইরানের সঙ্গে সেটা "করা খুব কঠিন।"

ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রোধ করার জন্য একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকা উপসাগরীয় অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে।

ফের আলোচনা 
ফেব্রুয়ারির শুরুতে ওমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরোক্ষ আলোচনা করেছে। তখত-রাভানচি নিশ্চিত করেছেন যে, আগামী মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) জেনেভায় দ্বিতীয় দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। তাঁর দাবি, প্রাথমিক আলোচনায় "কমবেশি ইতিবাচক দিকে ছিল তবে এখনই বিচার করা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।" ট্রাম্পও, ওমান পর্বের প্রথম আলোচনাকে ইতিবাচক বলে বর্ণনা করেছেন।

নমনীয়তার প্রমাণ হিসেবে তেহরান ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কমানোর প্রস্তাবের দিকে ইঙ্গিত করেছে। এই স্তরে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি হতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিকস্তরে সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে। মনে করা হয়েছে কেহরানের আপসের প্রস্তাবের পরও ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগিয়ে যেতে পারে, যা তারা ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে।

তখত-রাভানচি বলেন, "যদি আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কথা বলতে প্রস্তুত থাকে তবে আমরা আমাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত।" যদিও তিনি এটা বলতে অস্বীকার করেন যে, ইরান সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উপর জোর দেবে নাকি আংশিক ছাড় দেবে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির অধীনে ইরান ৪০০ কেজিরও বেশি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ পাঠাবে কিনা জানতে চাইলে তখত-রাভানচি বলেন, "আলোচনার সময় কী হবে তা বলা এখনই খুব কঠিন।"

‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ আলোচনার বিষয় নয়’
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ওয়াশিংটন আগে ইরানকে সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিল। তখত-রাভানচি বলেছেন, “শূন্য সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি এখন আর কোনও বিষয় নয় এবং ইরানের ক্ষেত্রে, এটা আর আলোচনার টেবিলে নেই।” এই মন্তব্য ট্রাম্পের সাম্প্রতিক দাবির  উল্টো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন,  “ইরানে আমরা কোনওভাবেই  ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চাই না।”

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির অধীনে তার অধিকারের লঙ্ঘন হিসাবে সম্পূর্ণ বন্ধকে বিবেচনা করে।

ইজরায়েলের চাপ এবং রুবিও-সহ মার্কিন কর্মকর্তাদের কোনও চুক্তির পরিধি বাড়ানোর আহ্বান সত্ত্বেও তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে- তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার অংশ হবে না। তখত-রাভানচি বলেন, “যখন ইজরায়েল এবং আমেরিকানরা আমাদের উপর আক্রমণ করেছিল, তখন আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র আমাদের কাজে লেগেছিল, তাহলে আমরা কীভাবে আমাদের প্রতিরক্ষামূলক ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হওয়া মেনে নিতে পারি।”  

যুদ্ধের সতর্কতা এবং আঞ্চলিক উদ্বেগ
ট্রাম্প মাঝে মাঝে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বলেছেন, সম্প্রতি বলেছেন: “মনে হচ্ছে এটাই সবচেয়ে ভাল হবে।” তখত-রাভানচি বলেন, আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ওমানের বিদেশমন্ত্রী সাইয়্যেদ বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদির মাধ্যমে প্রদত্ত ব্যক্তিগত বার্তায় এই ধরনের ভাষা প্রতিফলিত হয়নি। তাঁর কথায়, “আমরা শুনছি যে তারা আলোচনায় আগ্রহী। আমেরিকা ওমানের মাধ্যমে ব্যক্তিগত কথোপকথনে এটা বলেছে যে, তারা এই বিষয়গুলি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে আগ্রহী।”

তখত-রাভানচি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সতর্ক করে দেন যে- আরেকটি যুদ্ধ "মর্মান্তিক, সকলের জন্য খারাপ হবে, প্রত্যেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিশেষ করে যারা এই আগ্রাসন শুরু করেছে। যদি আমরা মনে করি এটা একটি অস্তিত্বগত হুমকি, তাহলে আমরা সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাবো। এই ধরণের পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না কারণ, পুরো অঞ্চলই গোলযোগের মধ্যে পড়বে।"

ইরান বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে যে, সংঘাতের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এই অঞ্চলে অবস্থানরত ৪০,০০০ এরও বেশি মার্কিন সৈন্য সম্পর্কে জানতে চাইলে, তাখত-রাভানচি বলেন, “এটি একটি ভিন্ন খেলা হবে।”

কাতার-সহ আঞ্চলিক শক্তিগুলি উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কায় নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযো বাড়াচ্ছে। তখত-রাভানচির কথায়, “আমরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলে প্রায় সর্বসম্মত চুক্তি দেখতে পাচ্ছি।” 

ভঙ্গুর বিশ্বাস, সতর্ক আশাবাদ
কূটনৈতিক পথ ভঙ্গুর। ইরান ইজরায়েলকে আলোচনাকে লাইনচ্যুত করার চেষ্টা করার অভিযোগ করেছে, গত জুনে ওমানে পরিকল্পিত আলোচনার ১২ দিনের আগে আকস্মিক হামলার ফলে ১২ দিনের সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল।

ইরানি কর্মকর্তারা আলোচনার দু'টি রাউন্ডের মধ্যে মার্কিন অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন।

পর্যবেক্ষকদের মধ্যে অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় থাকা সত্ত্বেও, তখত-রাভানচি বলেছেন যে, ইরান আশা নিয়ে জেনেভায় যাবে। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করব তবে অন্য পক্ষকেও প্রমাণ করতে হবে যে তারাও আন্তরিক।”