আজকাল ওয়েবডেস্ক: পড়াশোনার চাপে যখন নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়, ঠিক তখনই এক অদ্ভুত অথচ মিষ্টি দাওয়াই নিয়ে এল চিনের বেশ কিছু কলেজ। সাধারণত চিনা শিক্ষাব্যবস্থা মানেই যেখানে দিনরাত বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা আর ভালো ফলের ইঁদুর দৌড়, সেখানে এই কলেজগুলো পড়ুয়াদের দিচ্ছে এক সপ্তাহের ‘স্প্রিং ব্রেক’ বা বসন্তকালীন ছুটি। তবে এই ছুটি শুধু ঘরে বসে নেটফ্লিক্স দেখার জন্য নয়; কলেজ কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট নির্দেশ— ‘যাও, প্রকৃতিকে চেনো আর মন ভরে প্রেম করো!’

সিচুয়ান দক্ষিণ-পশ্চিম ভোকেশনাল কলেজ অফ এভিয়েশনসহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১ এপ্রিল থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত এই বিশেষ ছুটি ঘোষণা করেছে। কলেজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের ছুটির থিম হলো— ‘ফুল দেখো এবং রোম্যান্স উপভোগ করো’। কর্তৃপক্ষের এই নির্দেশ শুনে অনেকেই অবাক হয়েছেন। যেখানে আমাদের সমাজে পড়াশোনার মাঝে প্রেমকে দেখা হয় এক মস্ত বাধা হিসেবে, সেখানে কলেজের ডেপুটি ডিন বলছেন অন্য কথা। তাঁর মতে, সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে সময় কাটানো, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা বা জীবনের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করা পড়ুয়াদের চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটাবে। এতে শুধু যে তাঁদের মন ফ্রেশ হবে তাই নয়, তাঁদের শেখার ক্ষমতাও বহুগুণ বেড়ে যাবে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হল, এই সাত দিন পড়ুয়াদের কোনও  পেন্সিল ধরতে হবে না, করতে হবে না কোনও  একঘেয়ে হোমওয়ার্ক। তবে কি তাঁরা কিছুই শিখবেন না? অবশ্যই শিখবেন। কর্তৃপক্ষ নির্দেশ দিয়েছেন, এই ক’দিনে প্রকৃতি বা সম্পর্কের থেকে যা কিছু নতুন অভিজ্ঞতা হল, যা দেখলেন বা অনুভব করলেন— সেটুকুই শুধু ডায়েরিতে লিখে রাখতে। অর্থাৎ, পুঁথিগত বিদ্যার বদলে জীবনের পাঠ নিতেই বেশি উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু হঠাৎ এমন মানবিক বা রোম্যান্টিক হয়ে ওঠার পেছনে কি অন্য কোনও  কারণ আছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর নেপথ্যে রয়েছে চিনের গভীর এক দুশ্চিন্তা। গত কয়েক বছর ধরে চিনে জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, টানা চার বছর ধরে জনসংখ্যা নিম্নমুখী। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার অনীহা সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। তাই প্রশাসন চাইছে, অল্প বয়স থেকেই তরুণ-তরুণীরা যেন সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝে এবং নিজেদের মধ্যে মেলামেশার সুযোগ পায়। 

তাছাড়া, পর্যটন শিল্প এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করাও এই ছুটির অন্যতম লক্ষ্য। মানুষ ঘুরতে বেরোলে, রেস্তোরাঁয় গেলে বা কেনাকাটা করলে দেশের ভাঁড়ারে টান পড়বে না। সিচুয়ান এবং জিয়াংসুর মতো প্রদেশগুলো ইতিমধ্যেই এই পথ অনুসরণ করছে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের পরিকল্পনা হল, শহরগুলোকে শিশুদের জন্য আরও অনুকূল করে তোলা এবং তরুণদের বোঝানো যে একটি সুন্দর পরিবার গড়ে তোলার মধ্যেও এক বিশাল ব্যক্তিগত ও সামাজিক সার্থকতা রয়েছে। 

সব মিলিয়ে, চিনের এই ‘প্রেমের ছুটি’ বা ‘স্প্রিং ব্রেক’ এখন বিশ্বজুড়ে চর্চার বিষয়। বইয়ের পাতার বাইরেও যে একটা রঙিন পৃথিবী আছে এবং সেই পৃথিবীতে ভালোবাসারও যে একটা বড় জায়গা আছে— এই বার্তাই এখন পৌঁছাতে চাইছে কলেজগুলো। শেষ পর্যন্ত এই রোম্যান্টিক দাওয়াই চিনের জনসংখ্যার সংকট কাটাতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।