আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রকৃতির জগতে টিকে থাকার জন্য নানা প্রাণী অদ্ভুত কৌশল ব্যবহার করে। তারই এক বিস্ময়কর উদাহরণ হল রেড-নেকড কিলব্যাক সাপ। এই সাপ অত্যন্ত বিষাক্ত—এর ঘাড়ে জমা থাকা হলুদ রঙের তীব্র বিষের কয়েক ফোঁটাই একটি বেজিকে অন্ধ করে দিতে পারে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার হৃদস্পন্দন বন্ধ করে দিতে সক্ষম। তবে অবাক করার মতো বিষয় হল, এই সাপ নিজে সেই বিষ তৈরি করে না; বরং এটি চুরি করে নেয় তার খাদ্য থেকে।


এই সাপ প্রধানত বিষাক্ত ব্যাঙ, বিশেষ করে বাফোনিডি পরিবারের টোড খায়। এই টোডগুলোর চামড়ায় থাকে ‘বুফাডিয়েনোলাইড’ নামক এক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক। যখন কিলব্যাক সাপ এই টোড খায়, তখন তার অন্ত্র সেই বিষ শোষণ করে নেয় এবং পরে তা সাপের ঘাড়ে থাকা বিশেষ গ্রন্থিতে জমা হয়। এই গ্রন্থিগুলোকে বলা হয় ‘নুচাল গ্ল্যান্ড’, যা একাধিক জোড়ায় ঘাড়ে অবস্থিত।
এই বিষ জমা থাকলে সাপের আচরণও বদলে যায়। তখন তারা ভয় পায় না, বরং শত্রুর সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, ঘাড় ফুলিয়ে যেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। কিন্তু যদি সম্প্রতি তারা বিষহীন ব্যাঙ বা মাছ খেয়ে থাকে, তখন এই সাপগুলো অনেক বেশি ভীতু হয়ে পড়ে এবং দ্রুত পালিয়ে যায়।


বিজ্ঞানীরা আগে মনে করতেন, এই ধরনের সাপ তাদের শরীরে জমা বিষের পরিমাণ বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের আচরণ ঠিক করে। যেমন পিট ভাইপার বা র্যাীটলস্নেক নিজের তৈরি বিষের পরিমাণ অনুভব করতে পারে বলে মনে করা হয়। 


জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ টোমোনোরি কোদামা এবং তার সহকর্মীরা ২৩টি বন্য কিলব্যাক সাপের উপর পরীক্ষা চালান। কিছু সাপকে বিষাক্ত টোড খাওয়ানো হয়, আবার কিছু সাপকে বিষহীন ব্যাঙ খাওয়ানো হয়। কয়েক সপ্তাহ পরে গবেষকরা একটি নকল বেজির মতো আক্রমণের পরিস্থিতি তৈরি করেন। এরপর তারা সাপগুলোর নুচাল গ্ল্যান্ড থেকে বিষ বের করে দেন এবং আবার একইভাবে আক্রমণের পরিস্থিতি তৈরি করেন।


অবিশ্বাস্যভাবে দেখা যায়, সাপগুলো বুঝতেই পারেনি যে তাদের বিষ ফুরিয়ে গেছে। বিষ থাকার আগে এবং পরে—দুই ক্ষেত্রেই তারা একই রকম সাহসী আচরণ করেছে। গবেষণায় অংশ না নেওয়া সাপ বিশেষজ্ঞ ডেবোরাহ হাচিনসন বলেন, “এতে বোঝা যাচ্ছে, এই সাপগুলো সম্ভবত তাদের শরীরে থাকা বিষের পরিমাণ সম্পর্কে সরাসরি কোনো ধারণা পায় না, অথবা পেলেও তা আচরণে প্রভাব ফেলে না।”


তাহলে তারা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়? কোদামার মতে, সম্ভবত সাপগুলো তাদের সাম্প্রতিক খাদ্যের স্মৃতির ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ, যদি তারা সম্প্রতি বিষাক্ত টোড খেয়ে থাকে, তাহলে তারা আত্মবিশ্বাসী থাকে।

 


তবে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী কার্ট শভেঙ্ক মনে করেন, প্রকৃতিতে এই সাপগুলো নিয়মিতই বিষাক্ত খাদ্য পায়, ফলে তাদের বিষের ভাণ্ডার খুব একটা ফুরিয়ে যায় না। তাই হয়তো এই বিষ পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনই পড়ে না।
এই গবেষণা দেখায়, প্রকৃতির কৌশল কতটা জটিল এবং কখনো কখনো আমাদের ধারণার বাইরে।