আজকাল ওয়েবডেস্ক: বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি। প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এই দুই দল থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন এমন তিনজন সাংসদ যাঁরা এর আগে মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত আসামী ছিলেন। তিনজনের মধ্যে দু'জন ভারত-বিরোধী সন্ত্রাসবাদের মামলার সাজাপ্রাপ্ত ছিলেন। এঁরা হলেন, লুৎফুজ্জামান বাবর এবং আবদুস সালাম পিন্টু, বিএনপির প্রতীকে নির্বাচনে জয় পেয়েছেন। অন্যজন হলেন, জামাতের তরফে নির্বাচিত এটিএম আজহারুল ইসলাম। আপাতত এই তিনজনই বামংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে হাসিনা এবং তাঁর আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আগে, লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু এবং এটিএম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, মহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনকালে আদালত এই তিন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে মুক্তি দেয়।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারে লুৎফুজ্জামান বাবর একবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সময় বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় ছিল।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে, লুৎফুজ্জামান বাবর নেত্রকোনা-৪ আসন থেকে ১,৬০,০০০ এরও বেশি ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। তবে এক বছরের সামান্য বেশি সময় আগেই, বাবর সম্পূর্ণ ভিন্ন ভবিষ্যতের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
২০০৪ সালের ঢাকা গ্রেনেড হামলায় জড়িত থাকার অপরাধে ২০১৪ সালে বাবরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ওই গ্রেনেড হামলায় ২৩ জন নিহত এবং কমপক্ষে ৫০০ জন আহত হয়েছিলেন। যদিও হামলার মূল নিশানা ছিলেন সেই সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্র চোরাচালান মামলায় জড়িত থাকার জন্য বাবরকে ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনানো হয়। সেই সময়ে বাংলাদেশ পুলিশ এবং কোস্টগার্ড ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহীদের জন্য পাঠানো ১০টি ট্রাক অস্ত্র আটক করেছিল।
তবে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর, বাংলাদেশ হাইকোর্ট গত বছরের ১৪ জানুয়ারি, অস্ত্র চোরাচালান মামলায় লুৎফুজ্জামান বাবরকে বেকসুর খালাস করে দেয়। এর দু'দিন পর তিনি কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান।
বিএনপি-তে বাবরের সহকর্মী, আবদুস সালাম পিন্টুও একই ধরণের ঘটনার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। তিনি আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার অধীনে মন্ত্রিপরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বৃহস্পতিবারের বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে, পিন্টু প্রায় ২,০০,০০০ ভোটে টাঙ্গাইল-২ আসন থেকে জয়ী হন।
বাবরের মতো, ২০০৪ সালের ঢাকা গ্রেনেড হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে ২০১৬ সালে গ্রেপ্তার করা হয় এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি, পিন্টু পাকিস্তানের মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হরকাত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামী (হুজি)-কে সমর্থনেও অভিযুক্ত ছিলেন। এই সংগঠনই ২০০৬ সালে বারাণসীতে কোর্ট কমপ্লেক্স বোমা হামলা, ২০০৭ সালে আজমির শরীফ দরগায় বোমা হামলা এবং ২০১১ সালে দিল্লিতে বোমা বিস্ফোরণের মতো ভারতে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসবাদী হামলার কারিগর।
লুৎফুজ্জামান বাবরের মতো আবদুস সালাম পিন্টুকেও ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশের একটি আদালত সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্ত করে দেয়।
মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত থেকে সংসদে যাওয়া তৃতীয় ব্যক্তি হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম। এই বছরের নির্বাচনে, এটিএম প্রায় ১,৩৯,০০০ ভোট পেয়ে রংপুর-২ আসন থেকে জয়লাভ করেছেন। তিনি এর আগে ১৯৯৮, ২০০১ এবং ২০০৬ সালে একই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
২০১২ সালে, এটিএম আজহারুল ইসলামকে- বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তার করে। তাঁকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বিরুদ্ধে কমপক্ষে ১,২৫৬ জনকে হত্যা এবং ১৩ জন মহিলাকেকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। ২০১৪ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের ২৭ মে, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট এটিএমকে সমস্ত অভিযোগ থেকে খালাস করে দেয়।
এই তিন ব্যক্তির সংসদ নির্বাচনে জয় হাসিল ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে তারই প্রতিফলন। একসময় ফাঁসি ছাড়া আর কোনও ভবিতব্য ছিল না এই তিন জনের। এঁরাই এখন জনতার রায়ে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
