আজকাল ওয়েবডেস্ক: টানটান উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা আর প্রত্যাশার আবহে মঙ্গলবার সকালে শেষ হল বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারপর্ব। সংক্ষিপ্ত কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ এই নির্বাচনী লড়াই শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়েছে দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের মুখোমুখি সংঘাতে—বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যে। ২০০৮ সালের পর এটিই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন; গত তিনটি ভোট বিরোধী বয়কট ও কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর এই প্রথম নির্বাচন হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে ১৮ মাস ধরে দেশ পরিচালিত হচ্ছে, যা শুরুতে প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পরই এই রাজনৈতিক পর্বের সূচনা।
প্রচার শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনে পৃথক ভাষণে জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামাতের আমির শফিকুর রহমান। দুই ভাষণেই ছিল ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন, ভিন্ন অগ্রাধিকার এবং ইতিহাসের ভিন্ন পাঠ। ৩৭ মিনিটের ভাষণে তারেক রহমান ভোটারদের আহ্বান জানান ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দিয়ে “নিরাপদ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ” গড়ার সুযোগ দিতে। অতীতের সমালোচনা স্বীকার করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় “কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি” হয়ে থাকতে পারে এবং সে জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। দুর্নীতির অভিযোগ যে বিএনপির বড় দুর্বলতা, তা মাথায় রেখেই তিনি আইনের শাসন ও জবাবদিহির ওপর জোর দেন।
অন্যদিকে শফিকুর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামি ন্যায়বোধের কথা বলেন, তবে একইসঙ্গে জোর দিয়ে জানান, বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আক্রমণ হলে প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। তারেক রহমানও ধর্মের প্রসঙ্গ টেনে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর উল্লেখ করেন এবং সংবিধানে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” ফিরিয়ে প্রতিশ্রুতি দেন। তবে তিনি বলেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার”—যা সংখ্যালঘুদের আশঙ্কা কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই ভাষণের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গে। তারেক রহমান ১৯৭১-কে তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রাখেন—শহীদদের স্মরণ, জিয়াউর রহমানের ভূমিকার উল্লেখ এবং স্বাধীনতার সময় ধর্মীয় বিভাজন না থাকার কথা তুলে ধরেন। বিপরীতে, জামাত আমির মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ একবার সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করে দ্রুত ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের দিকে সরে যান। ১৯৭১ সালে জামাতের অবস্থান এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইতিহাস এখনো দলটির রাজনৈতিক দায় হিসেবে রয়ে গেছে—যা এই নীরবতার পেছনে কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই নির্বাচনে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ তরুণ। বিভিন্ন সমীক্ষায় ভিন্ন ভিন্ন চিত্র সামনে এসেছে। এক জরিপে দেখা গেছে প্রথমবার ভোটারদের বড় অংশ জামাতের দিকে ঝুঁকছেন, অন্য এক বৃহৎ সমীক্ষায় বিএনপির বিপুল এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত।
ঢাকার মগবাজারে ২৫ বছর বয়সী মহম্মদ হাবিব দ্য ওয়্যার-কে বলেন, হয়তো জামাতকে ভোট দেবেন। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি-ঘনিষ্ঠ কিছু গোষ্ঠী আগেভাগেই চাঁদাবাজি শুরু করেছে। অন্যদিকে বেসরকারি কর্মী সাইফুল ইসলাম বলেন, কোনো দলই পুরোপুরি সঠিক বা ভুল নয়। নিজেকে এক মুক্তিযোদ্ধার নাতি হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার তাঁর ভোটের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ, তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কোটা চালু থাকাও সমাধান নয়।
ভোটাররা সংসদীয় নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ নামে ৮৪ দফা সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোটেও অংশ নেবেন। উদ্দেশ্য নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার এবং রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কার। জামাত গণভোটের পক্ষে জোরালো প্রচার চালিয়েছে। বিএনপি সমর্থন জানালেও অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সাংবিধানিক পরিবর্তন আনার প্রশ্নে তাদের ভেতরে দ্বিধা রয়েছে।
ইতিমধ্যে ১০ লাখের বেশি ভোটার ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী। প্রথমবারের মতো আইটি-সমর্থিত হাইব্রিড পোস্টাল ভোটিং চালু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ২৯৯টি আসনে ৪২ হাজারের বেশি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে সকাল ৭:৩০ থেকে বিকেল ৪:৩০ পর্যন্ত। ভ্রমণ ও যানবাহন চলাচলে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যাতে কারচুপি ও ভয়ভীতি রোধ করা যায়।
ভোট স্থগিতের গুজব ছড়ালে নির্বাচন কমিশন তা নস্যাৎ করে জানিয়েছে, নির্ধারিত দিনেই নির্বাচন হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিপ্লব-পরবর্তী এক সংবেদনশীল সময়ে দেশ ভোটের মুখোমুখি হচ্ছে। মানুষের মনে সংশয় থাকলেও দীর্ঘদিন পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সম্ভাবনা অনেকের মধ্যেই নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
বৃহস্পতিবার ভোট, শুক্রবার ভোরের মধ্যে প্রাথমিক ফলাফল আসতে পারে। ১৩ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা হবে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশ আবার ব্যালটের সামনে—এবারের রায় শুধু সরকার বদলের নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ধারণেরও।
