আজকাল ওয়েবডেস্ক: একটি সাধারণ “গার্লস’ গেটঅ্যাওয়ে” যে এমন ঐতিহাসিক মুহূর্তে বদলে যেতে পারে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। গত শনিবার পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় পর্যটন শহর বাসেলটনে সমুদ্রের দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার প্রসারিত কাঠের জেটিতে হাঁটতে গিয়ে চার বন্ধুর সামনে হঠাৎই ভেসে উঠল এক বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির তিমি—একটি প্রায় ২৪ মিটার লম্বা পিগমি ব্লু হোয়েল।

পারথ থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টার দূরত্বে থাকা বাসেলটনে সেদিন ছুটির আমেজে ছিলেন মেগান উড, সোফিয়া ফুইমাওনো, টোনেয়া স্কাফিডি এবং আইনসলি টিয়ার্নি। জিওগ্রাফ বে-তে ডলফিনের ঝাঁক দেখতে দেখতেই আইনসলি মজা করে বলেছিলেন, জেটিতে হাঁটলে হয়তো তিমিও দেখা যেতে পারে—কারণ এই সময় তারা উপকূল বরাবর ভ্রমণ করে। বন্ধুরা প্রথমে বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন। “আমরা সবাই চোখ উল্টে দিয়েছিলাম—ভেবেছিলাম, এমনটা হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই,” হাসতে হাসতে ইয়াহু নিউজ অস্ট্রেলিয়াকে বলেন মেগান।

কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে আইনসলির সেই ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ই সত্যি হয়ে গেল। দক্ষিণ গোলার্ধের দীর্ঘতম কাঠের জেটিতে হাঁটার সময় হঠাৎই তাদের পায়ের ঠিক নীচে, মাত্র ১০ মিটারেরও কম দূরত্বে, নীল জলে ধীরে ভেসে উঠল বিশাল এক পিগমি ব্লু হোয়েল। “আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, এটা কি সত্যি? আমরা সবাই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম,” বলেন মেগান। “এত বড় হয়েও কী অসাধারণভাবে শান্ত আর স্নিগ্ধভাবে সে চলছিল—দৃশ্যটা ছিল শ্বাসরুদ্ধকর।”

ঘটনার মুহূর্তের ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল। প্রায় সাত মিটার গভীর স্বচ্ছ নীল জলে তিমিটিকে ধীরে ধীরে জেটির নীচ দিয়ে চলে যেতে দেখা যায়। সে সময় জেটিতে ভিড় কম থাকায়, খুব কাছ থেকে দৃশ্যটি উপভোগ করার সৌভাগ্য হয়েছিল ওই চার বন্ধু এবং এক দম্পতির। “ওই দম্পতিই বলেছিলেন—‘এটা তো ব্লু হোয়েল!’” জানান আইনসলি। আনন্দে উচ্ছ্বসিত বন্ধুরা তিমিটির নামও রেখে দেন—‘ব্যারি দ্য ব্লু’।

এই বিরল সাক্ষাতের পর দিনগুলোতে চার বন্ধু নিজেদের ‘ব্লু হোয়েল ফান ফ্যাক্টস’-এর স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞ বলে দাবি করছেন। মেগান বলেন, “আমরা জেনেছি, ওই এলাকায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিমি নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরাও কখনও জেটি থেকে ব্লু হোয়েল দেখেননি। ঘটনাটা সত্যিই অত্যন্ত বিরল।” তাদের কথায়, “এই অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে। এমন ইতিবাচক খবর লাখো মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পেরে আমরা ভীষণ খুশি।”

&t=2s

উল্লেখ্য, এটাই প্রথম নয়। চলতি বছরের মে মাসে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকূলে চেইনিস বিচে সমুদ্রতীর থেকে মাত্র ১৫ মিটার দূরে একটি পিগমি ব্লু হোয়েল দেখা গিয়েছিল। সেই সময় বন্যপ্রাণ আলোকচিত্রী ব্রায়ান উইলি একটি হামপব্যাক তিমির ছবি তুলছিলেন, যখন হঠাৎ আরও বড় একটি তিমি দৃশ্যপটে আসে। “নীলচে রঙ আর অস্বাভাবিক দৈর্ঘ্য দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম—এটা ব্লু হোয়েল,” জানান তিনি। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই তীরে থাকা মানুষজন উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন।

অস্ট্রেলিয়ান মেরিন কনজারভেশন সোসাইটির থ্রেটেন্ড স্পিসিস ক্যাম্পেন ম্যানেজার অ্যালেক্সিয়া ওয়েলবেলোভ জানান, অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় পিগমি ব্লু হোয়েল এবং অ্যান্টার্কটিক ব্লু হোয়েল—এই দুই উপপ্রজাতির ব্লু হোয়েল দেখা যায়। প্রতি বছর বিপন্ন পিগমি ব্লু হোয়েলরা দক্ষিণ ও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার খাদ্যভূমি থেকে ইন্দোনেশিয়ার দিকে প্রজননের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে—এই কারণেই তাদের ‘ইন্দো-অস্ট্রেলিয়ান পিগমি ব্লু হোয়েল’ নামেও ডাকা হয়। সেপ্টেম্বর নাগাদ তারা আবার দক্ষিণে ফেরে, পথে বাসেলটনের জিওগ্রাফ বে অতিক্রম করে।

এই তিমিরা দৈর্ঘ্যে ২৪ মিটার পর্যন্ত হতে পারে এবং আয়ু প্রায় ৯০ বছর। অথচ এত বিশাল প্রাণী হয়েও তাদের প্রকৃত জনসংখ্যা সম্পর্কে খুব কম তথ্য রয়েছে। ওয়েলবেলোভ বলেন, “অ্যান্টার্কটিক ব্লু হোয়েলের সংখ্যা আনুমানিক ২,০০০ বলে জানা গেলেও পিগমি ব্লু হোয়েলের সঠিক সংখ্যা এখনও অজানা।”

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খাদ্যভূমির পরিবর্তন এবং বাণিজ্যিক ও বিনোদনমূলক জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ—এমন নানা হুমকির মুখে রয়েছে এই তিমিরা। তবে আশার কথা, গবেষণাও চলছে। জুন মাসে গবেষকরা চারটি পিগমি ব্লু হোয়েলের শরীরে অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট ট্যাগ বসিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মেরিন সায়েন্সের (AIMS) গবেষক ড. মিশেল থামস জানান, এই ট্যাগের মাধ্যমে তিমিদের পরিযানপথ, ডুব দেওয়ার আচরণ এবং খাদ্যসংগ্রহ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

বাসেলটনের জেটিতে চার বন্ধুর সেই হঠাৎ সাক্ষাৎ শুধু একটি সৌভাগ্যের ঘটনা নয়—এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি এখনও কতটা বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে, আর সেই বিস্ময় রক্ষা করাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।