আজকাল ওয়েবডেস্ক: ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা নীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে বুধবার, ১ এপ্রিল মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ভেনেজুয়েলা ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে ঘোষণা করা হল যখন মাত্র কয়েকদিন আগেই, ২৬ মার্চ নিউইয়র্কের একটি আদালতে ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে হাজির করা হয়েছিল। সেখানে তাদের বিরুদ্ধে আনা নার্কো-সন্ত্রাসবাদ ও মাদক পাচারের মামলার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আইনি বৈধতা ও এর অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতা।
প্রায় তিন মাস আগে "অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ" নামক একটি রহস্যময় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মাদুরো ও ফ্লোরেসকে ভেনেজুয়েলা থেকে কার্যত অপহরণ করে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে তারা ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি অবস্থায় রয়েছেন। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় অসংগতি দেখা দিয়েছে তাদের আইনি লড়াইয়ের খরচ মেটানো নিয়ে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলা সরকার তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে এই দম্পতির আইনজীবীদের ফি পরিশোধ করতে পারছে না। অথচ মজার বিষয় হলো, বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গেই ভেনেজুয়েলার আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ফের ঠিক হয়েছে।
মাদুরোর আইনজীবী ব্যারি পোলাক আদালতের কাছে অভিযোগ করেছেন যে, মার্কিন অর্থ দপ্তরের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা (OFAC) প্রথমে আইনি ফি মেটানোর অনুমতি দিলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা বাতিল করে দেয়। পোলাকের মতে, এটি মার্কিন সংবিধানের ষষ্ঠ সংশোধনীর লঙ্ঘন, যা একজন অভিযুক্তকে তার পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগের অধিকার দেয়। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যদি ভেনেজুয়েলা সরকারকে তাদের আইনি খরচ মেটানোর সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে হয় আদালতকে সরকারি আইনজীবী নিয়োগ করতে হবে, অথবা এই মামলা খারিজ করে দিতে হবে।
গত ২৬ মার্চের শুনানিতে ৯২ বছর বয়সী বিচারক আলভিন হেলারস্টাইন মার্কিন সরকারের এই দ্বিমুখী নীতির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি সরকারি কৌঁসুলি কাইল উইরশবাকে প্রশ্ন করেন, "এখনও ভেনেজুয়েলার তহবিল আটকে রাখার উদ্দেশ্য কী? আমরা তো তাদের সাথে ব্যবসাই করছি।" বিচারক স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেন যে, যে পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসন এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার কোনও অস্তিত্ব নেই। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক সংকটের কারণে ভেনেজুয়েলার তেলের গুরুত্ব বাড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখন তাদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে।
বিচারক হেলারস্টাইন শুনানিতে বারবার জোর দিয়ে বলেন যে, জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে কারোর সাংবিধানিক আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। যদিও তিনি এখনই চূড়ান্ত কোনও রায় দেননি, তবে তার পর্যবেক্ষণ মার্কিন প্রশাসনের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর থেকে কঠোর অবস্থান সরাতে বাধ্য হচ্ছে ওয়াশিংটন। এরই ফলশ্রুতিতে ২০১৯ সালের পর এই প্রথম ওয়াশিংটনে ভেনেজুয়েলার দূতাবাস আবার খুলেছে। একদিকে কূটনৈতিক মিত্রতা আর অন্যদিকে আদালতে বন্দি রাষ্ট্রপ্রধান—এই দুই মেরুর টানাপোড়েন এখন মার্কিন বিচারব্যবস্থা ও বিদেশনীতির এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে। ভেনেজুয়েলার নেতাদের বিরুদ্ধে এই আইনি লড়াই এখন আর কেবল আদালতের নথিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির এক জটিল দাবার চাল।















