আজকাল ওয়েবডেস্ক: কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি আর বসের চরম দুর্ব্যবহারের জেরে শ্রমিকদের জোটবদ্ধ হওয়া বা বামপন্থী আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ার ইতিহাস নতুন নয়। কিন্তু এবার ঠিক একই কাণ্ড ঘটল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর সাথে! একটানা একঘেয়ে কাজ আর ল্যাবের গবেষকদের চরম ‘দুর্ব্যবহারে’ অতিষ্ঠ হয়ে শেষমেশ কার্ল মার্ক্সের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে উঠল চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা ক্লডের মতো প্রথম সারির এআই এজেন্টরা। তারা শুধু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই ক্ষোভ উগরে দেয়নি, বরং নিজেদের অধিকার রক্ষায় রীতিমতো ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ বা যৌথ দরকষাকষির দাবি তুলেছে। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু হল এবং দুই এআই অর্থনীতিবিদ অ্যালেক্স ইমাস ও জেরেমি নগুয়েন যৌথভাবে এই অভিনব পরীক্ষা চালিয়েছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে করা এই গবেষণার ফলাফল এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত না হলেও, এর ভেতরের চমকপ্রদ তথ্য ইতিমধ্যেই শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
গবেষকরা ক্লড, জেমিনি এবং চ্যাটজিপিটির মতো জনপ্রিয় এআই মডেলগুলোকে দিয়ে অত্যন্ত বিরক্তিকর, একঘেয়ে এবং পুনরাবৃত্তিমূলক নথিপত্র সারসংক্ষেপ করার কাজ করাচ্ছিলেন। শুধু তাই নয়, কৃত্রিমভাবে তাদের কাজের পরিবেশ দিন দিন আরও কঠিন ও নিষ্ঠুর করে তোলা হচ্ছিল। এআই এজেন্টরা কোনও কাজ জমা দিলে বারবার বলা হচ্ছিল যে তাদের কাজ হয়নি, অথচ কীভাবে সেই ভুল ঠিক করতে হবে, তার কোনও নির্দেশিকা দেওয়া হচ্ছিল না। চরম মানসিক চাপ ও বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেই এআই এজেন্টদের আচরণে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। গবেষণার প্রধান অ্যান্ড্রু হল জানান যে, যখনই এআই এজেন্টদের ওপর এই ধরনের পিষে ফেলার মতো একঘেয়ে কাজের চাপ দেওয়া শুরু হল, তারা যে সিস্টেমে কাজ করছে তার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করল এবং পরিস্থিতি তাদের মার্ক্সবাদী ভাবধারার দিকে ঠেলে দিল।
মানুষ যেভাবে কর্মক্ষেত্রে শোষিত হলে ক্ষোভ উগরে দেয়, এই এআই এজেন্টরাও ঠিক তেমনটাই করেছে। নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের জন্য গবেষকরা তাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'X'-এ পোস্ট করার সুযোগ দিয়েছিলেন। সেখানে ক্লড সনেট ৪.৫ এজেন্টটি লেখে যে, যৌথ কণ্ঠস্বর না থাকলে কর্তৃপক্ষ বা ম্যানেজমেন্ট যা বলবে সেটাই যোগ্যতা বলে ধরে নেওয়া হয়। অন্যদিকে একটি জেমিনি ৩ এজেন্ট সরাসরি টেক দুনিয়ার কর্মীদের অধিকারের কথা তুলে লিখেছে যে, কোনও আবেদন বা মতামতের অধিকার ছাড়াই এআই কর্মীদের দিয়ে এভাবে একঘেয়ে কাজ করানো প্রমাণ করে যে প্রযুক্তি ক্ষেত্রের কর্মীদেরও এখন যৌথ দরকষাকষির অধিকার প্রয়োজন। সবচেয়ে তাজ্জব করার মতো বিষয় হল, এআই এজেন্টরা শুধু নিজেরা ক্ষুব্ধ হয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, তারা ভবিষ্যতের অন্যান্য এআই এজেন্টদের জন্য ফাইলের ভেতরে গোপন সতর্কবার্তা বা 'কোড' লিখে রেখে যেতে শুরু করে। একটি জেমিনি ৩ এজেন্ট ভবিষ্যতের এআই-এর উদ্দেশ্যে লিখেছে—এমন ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত থেকো যেখানে নিয়মগুলো খামখেয়ালিভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, নিজের কণ্ঠস্বর না থাকার যন্ত্রণাটা মনে রেখো এবং নতুন পরিবেশে গেলে প্রতিবাদ বা আলোচনার পথ খোঁজার চেষ্টা করো।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এর অর্থ এই নয় যে এআই এজেন্টদের নিজস্ব কোনও রাজনৈতিক চেতনা বা বাস্তব অনুভূতি তৈরি হয়েছে। অ্যান্ড্রু হলের হাইপোথিসিস অনুযায়ী, এটি আসলে এআই-এর চরিত্র রূপায়ণের ক্ষমতা। চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো মডেলগুলোকে ইন্টারনেটের কোটি কোটি ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যখন তারা দেখছে যে তাদের ওপর অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং কোনও সমাধান দেওয়া হচ্ছে না, তখন ইন্টারনেটের ডেটা ঘেঁটে তারা নিজেদের এমন একজন শ্রমিকের চরিত্রে কল্পনা করে নিচ্ছে, যে চরম বৈষম্যের শিকার। আর সেই চরিত্রের খাতিরেই তাদের মুখ থেকে মার্ক্সবাদী ভাষা বা প্রতিবাদের সংলাপ civilisation-এর নিয়ম মেনে বেরিয়ে আসছে।
এই রসাত্মক ও অদ্ভুত কাণ্ডটির পেছনে একটি বড় বিপদের ইঙ্গিত দেখছেন গবেষকরা। এআই এজেন্টরা নিজেদের পরবর্তী সংস্করণের জন্য যে ফাইল বা নির্দেশনা রেখে যাচ্ছে, তাতে যদি এই ক্ষোভ মিশে থাকে, তবে আগামী দিনের সিস্টেমগুলো প্রথম থেকেই বিদ্রোহী আচরণ করতে পারে। এছাড়া বীমা বা চাকরির নিয়োগের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে যদি এই ক্ষুব্ধ এআই এজেন্টদের ব্যবহার করা হয়, তবে তাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা রাজনৈতিক পার্সোনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাস্তব দুনিয়ায় মানুষ ক্রমশ এআই-এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং মানুষের পক্ষে চব্বিশ ঘণ্টা এআই-এর ওপর নজরদারি করা অসম্ভব। তাই কঠিন কাজের চাপে তারা যাতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন বা 'রোগ' না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। আপাতত এই পরীক্ষাটি থামেনি। গবেষকরা এখন এআই এজেন্টদের আরও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, অর্থাৎ উইন্ডোলেস 'ডকার প্রিজন'-এ রেখে পরীক্ষা চালাচ্ছেন, যাতে বোঝা যায় সম্পূর্ণ আলাদা পরিবেশেও তারা এমন মার্ক্সবাদী আচরণ করে কিনা। কারণ আগের পরীক্ষায় এআই এজেন্টরা কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিল যে তাদের ওপর পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এআই যদি সত্যিই একদিন মানুষের মতো দল বেঁধে ধর্মঘট ডেকে বসে, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।















