আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রায় এক বছর আগে জম্মু ও কাশ্মীরে এক ট্রাকচালককে নিয়ে সম্প্রচারিত একটি বিতর্কিত খবরের জেরে অবশেষে জরিমানা গুনতে হচ্ছে Zee News-কে। সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো একটি যাচাই না-করা ভিডিও সম্প্রচার করে বিভ্রান্তিকর দাবি করার জন্য চ্যানেলটিকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছে News Broadcasters and Digital Standards Authority (এনবিডিএসএ)।
কী অভিযোগ ছিল?
২০২৫ সালের ৩ মার্চ সম্প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে জি নিউজ দাবি করেছিল, জম্মু-কাশ্মীরের একটি জাতীয় সড়কে এক মুসলিম ট্রাকচালক ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি মাঝরাস্তায় দাঁড় করিয়ে নামাজ পড়তে নেমেছিলেন, যার ফলে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বলেন, “অন্য পাশের রাস্তা ফাঁকা ছিল, কারণ ওই চালকের মতো কেউ সেখানে নামাজ পড়েনি।” একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নামাজের সময় হওয়ায় চালক গাড়ি রাস্তার পাশে না সরিয়ে মাঝখানেই রেখে দেন।
যদিও সম্প্রচারের সময় চ্যানেলটি জানায় যে তারা ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেনি, তবু সেই ভিডিও দেখিয়ে চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলা হয়।
পরে কী সামনে আসে?
কয়েকদিনের মধ্যেই ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা Alt News আরও পরিষ্কার একটি ভিডিও সামনে আনে। সেখানে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ট্রাকচালক নিজেও অন্যান্য গাড়ির সঙ্গে দীর্ঘ লাইনে আটকে ছিলেন। সেই সময় জম্মুর রামবান এলাকায় এক লেন দিয়ে যান চলাচল এবং পাথর পড়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রশাসনিক সতর্কতাও জারি ছিল। অর্থাৎ, ট্রাকচালকের জন্যই যানজট তৈরি হয়েছিল—এমন দাবি ভিত্তিহীন ছিল।
এই সম্প্রচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান ইন্দ্রজিত ঘোরপাড়ে, উৎকর্ষ মিশ্র এবং জামিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের আইনজীবী সায়েদ কাব রাশিদি। তাঁদের অভিযোগ ছিল, যাচাই না-করা ভিডিও দেখিয়ে এক মুসলিম ট্রাকচালককে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা হয়েছে, যা সম্প্রচার নীতির পরিপন্থী।
&t=1sএনবিডিএসএ-র চেয়ারপার্সন ও প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি A.K. Sikri-র নেতৃত্বে নভেম্বর মাসে এই বিষয়ে শুনানি হয়। জি নিউজ লিখিত ও মৌখিক জবাবে জানায়, তারা ভিডিওটিকে ‘যাচাই করা তথ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করেনি এবং সম্প্রচার নীতিভঙ্গ করেনি।
তবে এনবিডিএসএ তাদের আদেশে স্পষ্ট জানায়, সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া যাচাই না-করা কনটেন্ট ব্যবহার করা একটি “স্পষ্ট ও গুরুতর ত্রুটি”। এটি সম্প্রচার নীতির ‘নির্ভুলতা’র মূলনীতির পরিপন্থী।
আদেশে বলা হয়েছে, লঙ্ঘনের প্রকৃতি বিবেচনায় আরও বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা যেত। কিন্তু চ্যানেলটি পরবর্তীতে বিতর্কিত ভিডিও মুছে ফেলায় ১ লক্ষ টাকাতেই জরিমানা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
ছয় দফা নির্দেশিকা
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে এনবিডিএসএ তাদের সদস্য সংবাদমাধ্যমগুলির জন্য ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছে। সেগুলির মূল কথা হল—
১. সামাজিক মাধ্যম থেকে সংগৃহীত তথ্য, ছবি বা ভিডিও সম্প্রচারের আগে অবশ্যই যাচাই করতে হবে।
২. সম্ভব হলে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং, প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ বা সরকারি সূত্র দিয়ে তা মিলিয়ে দেখতে হবে।
৩. ভিডিও বা ছবির বিকৃতি, কারচুপি বা এআই-নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে হবে।
৪. প্রেক্ষিত ছাড়া কনটেন্ট উপস্থাপন করা যাবে না, কারণ তাতে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে।
৫. সামরিক অভিযান, সাম্প্রদায়িক হিংসা বা অস্থিরতার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ‘জনস্বার্থ’ ও ‘নির্ভুল হওয়া’—এই দুই মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
৬. শুধু এই বলে দায় এড়ানো যাবে না যে ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে এবং তার সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
ডিজিটাল যুগে সংবাদমাধ্যমের বড় অংশই দ্রুততার সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট ব্যবহার করছে। কিন্তু সেই তাড়াহুড়ো কখনও কখনও বিভ্রান্তি, ভুল তথ্য কিংবা এআই-নির্মিত ভুয়ো ভিডিওর বিস্তার ঘটাতে পারে। এনবিডিএসএ-র এই নির্দেশিকা কার্যত সংবাদমাধ্যমগুলিকে স্মরণ করিয়ে দিল—দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতা এবং দায়িত্ববোধই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।
এই রায় শুধু একটি চ্যানেলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং সমগ্র টেলিভিশন ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের জন্য এক সতর্কবার্তা—যাচাইহীন তথ্যের উপর ভর করে জনমত প্রভাবিত করার ঝুঁকি আর নেওয়া চলবে না।
