পৃথিবীর গভীরে লুকিয়ে থাকা সোনা মানবসভ্যতার ইতিহাস জুড়ে বিস্ময়, লোভ ও সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু বিশাল সোনার ডেলা—যেগুলোকে আমরা “নাগেট” বলি—সেগুলোর জন্ম কীভাবে হয়?
2
12
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, ভূমিকম্প এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া-র কিছু খনিতে পাওয়া অস্বাভাবিক বড় সোনার ডেলার উৎস বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকেরা ভূমিকম্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন।
3
12
ভূমিকম্প সাধারণত পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে ঘটে। এই নড়াচড়ার সময় ভূগর্ভে বিশাল চাপের সৃষ্টি হয় এবং শিলাস্তরে ফাটল ধরে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ফাটলগুলোর মধ্য দিয়েই গরম, খনিজসমৃদ্ধ তরল উপরে উঠে আসে।
4
12
এই তরলে সোনাসহ বিভিন্ন ধাতব উপাদান দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। যখন ভূমিকম্পের কারণে হঠাৎ চাপ কমে যায়, তখন সেই তরল থেকে সোনা দ্রুত স্ফটিক আকারে বেরিয়ে আসে এবং ফাটলের গায়ে জমা হতে শুরু করে।
5
12
মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়-এর গবেষকেরা পরীক্ষাগারে দেখিয়েছেন যে, চাপের আকস্মিক পরিবর্তন সোনার কণাগুলোকে একত্রিত হতে সাহায্য করে। তাদের মতে, ভূমিকম্পের কম্পনের ফলে শিলার ফাটলগুলিতে থাকা তরল হঠাৎ বাষ্পীভূত বা রাসায়নিকভাবে পরিবর্তিত হয়।
6
12
এতে সোনার কণা দ্রুত জমাট বেঁধে ছোট দানার পরিবর্তে বড় ডেলায় রূপ নিতে পারে। এই প্রক্রিয়া একবার নয়, বহুবার ঘটতে পারে—প্রতিটি ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গে সোনার স্তর একটু একটু করে মোটা হয়।
7
12
বিশেষ করে ভিক্টোরিয়া অঞ্চলের প্রাচীন সোনার খনিগুলো এই তত্ত্বকে সমর্থন করে। উনিশ শতকের গোল্ড রাশের সময় এখান থেকে অসংখ্য বড় সোনার ডেলা পাওয়া গিয়েছিল।
8
12
গবেষণা বলছে, এই অঞ্চলটি অতীতে অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ ছিল। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বারবার কম্পনের কারণে সোনার স্তর জমা হয়ে বিশাল আকার ধারণ করে।
9
12
এছাড়া বিজ্ঞানীরা “পাইযোইলেকট্রিক প্রভাব”-এর কথাও উল্লেখ করেছেন। কিছু শিলা, বিশেষত কোয়ার্টজ, চাপের প্রভাবে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি করতে পারে।
10
12
ভূমিকম্পের সময় যখন এই শিলাগুলোতে চাপ পড়ে, তখন সৃষ্ট বৈদ্যুতিক চার্জ সোনার আয়নকে আকর্ষণ করতে পারে। এর ফলে সোনা নির্দিষ্ট স্থানে দ্রুত জমা হয় এবং বড় ডেলার আকার নেয়।
11
12
তবে সব সোনার ডেলা যে শুধুই ভূমিকম্পের কারণে তৈরি, তা নয়। নদীর স্রোত, ক্ষয়প্রক্রিয়া ও অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনও সোনার দানা বড় করতে ভূমিকা রাখে। তবুও ভূমিকম্প যে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে সোনার ঘন সঞ্চয় ঘটাতে পারে, তা এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
12
12
এই আবিষ্কার শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটায় না, ভবিষ্যতের খননকার্যেও নতুন দিকনির্দেশ দিতে পারে। যেখানে অতীতে ঘন ঘন ভূমিকম্প হয়েছে, সেই অঞ্চলগুলোতে বড় সোনার ডেলা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি হতে পারে। অর্থাৎ, পৃথিবীর গভীরের কম্পনই হয়তো মাটির উপরের সোনালি বিস্ময়ের নেপথ্য কারিগর।