আজকাল ওয়েবডেস্ক: কেন্দ্রীয় সরকার, সংসদে 'সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিল, ২০২৬' পেশ করেছে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এই যুগান্তকারী আইনটির লক্ষ্য হল সংসদীয় আসন বণ্টনের ওপর গত ৫০ বছর ধরে আরোপিত স্থবিরতার অবসান ঘটানো। এর ফলে লোকসভার মোট সদস্য সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বেড়ে আনুমানিক ৮৫০ হতে পারে।
'নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম'-এর বিধান অনুযায়ী, নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থাটি সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং সর্বশেষ আদমশুমারির তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। ৩৩ শতাংশ নারী সংরক্ষণ বিলটি কার্যকর করার জন্য বর্তমান বিলটি একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত। উল্লেখ্য যে, এই নারী সংরক্ষণ বিলটি ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচন থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে, এই প্রস্তাবটি ইতিমধ্যেই দেশের উত্তর ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
নতুন সংসদের রূপরেখা:
নির্বাচন কমিশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, 'সীমানা পুনর্নির্ধারণ' হল নির্বাচনী এলাকা বা কেন্দ্রের সীমানা নির্ধারণের এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সারা দেশে প্রতিটি ভোটের মূল্য বা গুরুত্ব যেন মোটামুটি সমান হয়, তা নিশ্চিত করা হয়।
২০২৬ সালের বিলটির মূল বিধানসমূহ:
এই প্রস্তাবে এমন একটি লোকসভার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে, যা আনুমানিক ৮১৫ জন রাজ্য-প্রতিনিধি এবং ৩৫ জন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত হবে। এর ফলে নতুন সংসদ ভবনে দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
১৯৭৬ সালে একটি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে স্থির করা হয়েছিল যে, আসন সংখ্যা ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতেই থাকবে। যাতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকারী রাজ্যগুলো (দক্ষিণ ভারত) রাজনৈতিক ক্ষমতা না হারায় তাই এই পদক্ষেপ ছিল। এই স্থগিতাদেশ বারবার বাড়ান হয়েছে। আধুনিক জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটাতে এই নিয়ম থেকে সরে আসার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এবার নির্বাচনী এলাকার নতুন সীমানাগুলো নির্ধারিত হবে সাম্প্রতিকতম জনসংখ্যার তথ্যের ভিত্তিতে (এক্ষেত্রে ২০১১ সালের এবং আসন্ন ২০২১/২০২৬ সালের জমগণনার তথ্যকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হবে)।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি 'সীমানা পুনর্নির্ধারণ কমিশন'-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এই কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এর ফলে নির্বাচনী এলাকার চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি যেকোনও ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত ও স্বাধীনভাবে সম্পন্ন হবে।
উত্তর ও দক্ষিণের বিভাজন:
এই সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়ার মূল বিতর্কটি দানা বেঁধেছে এর 'জনসংখ্যা-ভিত্তিক' প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে।
সমালোচকদের যুক্তি হল, ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো (তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা) পরিবার পরিকল্পনা সফলভাবে কার্যকর করেছে, ফলে সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধীর। অন্যদিকে, উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোতে (যেমন- উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ) জনসংখ্যা অনেক বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর ভয় হল, তারা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে ভাল কাজ করেও রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের মতে, শুধু জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বাড়ালে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাবে এবং হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোর আধিপত্য বাড়বে।
এর বিপরীতে, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া উত্তরের রাজ্যগুলোতে আসন সংখ্যা অনেকটাই বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজেপির যুক্তি:
ভারতীয় জনতা পার্টি মনে করছে এটা ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত। তাদের যুক্তি হল, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট, এক মূল্য’ হওয়া উচিত। অর্থাৎ প্রত্যেক সংসদ সদস্যের প্রায় একই সংখ্যক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা উচিত। তাদের দাবি, কেরলের একজন সংসদ সদস্য যেখানে মাত্র ১৮ লাখ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন, সেখানে উত্তর প্রদেশের একজন সংসদ সদস্যকে ২৭ লাখ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করতে হয় - এটি অগণতান্ত্রিক।
কেন প্রতিবাদ?
দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর নেতারা এর বিরোধিতা করছেন। তাঁদের মতে, শুধু জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করা হলে, সেটি কার্যত উত্তর ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে পুরস্কৃত করবে এবং দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোকে শাস্তি দেবে। কারণ, দক্ষিণের রাজ্যগুলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন করেছে। ইতিমধ্যে দক্ষিণের রাজ্যগুলো দেখছে, একই কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের কর রাজস্ব থেকে তাদের অংশ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। তাঁদের, একটি একজাতীয় সমাজে আসন বণ্টনের ভিত্তি হিসেবে জনসংখ্যা প্রধান মাপকাঠি হতে পারে, কিন্তু বারতের মতো বহু বিচিত্র সমাজে এই নিয়ম অনুসরণ সঠিক হবে না।
সীমানা নির্ধারণ কমিশনের বিধিমালা
সীমানা নির্ধারণ বিলটি এমন একটি সীমানা নির্ধারণ কমিশন গঠনের বিধান রাখে, যার নিয়মাবলি ২০১১ সালে গঠিত পূর্ববর্তী কমিশনের বিধানাবলির অনুরূপ।
সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায়, এই কমিশন কর্তৃক জারিকৃত আদেশসমূহ আইনের সমতুল্য মর্যাদা বহন করে। একবার এই আদেশসমূহ চূড়ান্ত হয়ে গেলে, কোনও আদালতে সেগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ বা চ্যালেঞ্জ করা যায় না। এর ফলে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি এমন দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াই থেকে সুরক্ষিত থাকে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারত।
কমিশনের আদেশসমূহ ভারতের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত ও ঘোষিত একটি নির্দিষ্ট তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়।
যদিও চূড়ান্ত আদেশের অনুলিপিগুলো লোকসভা এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্য বিধানসভাগুলোতে পেশ করা হয়, তবুও এই সংস্থাগুলো কেবল প্রতিবেদনটির প্রাপক হিসেবেই ভূমিকা পালন করে।
২০২৯ সাল পর্যন্ত সময়রেখা:
'নারী সংরক্ষণ আইন'- যা ২০২৬ সালের শুরুর দিকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে, তার বাস্তবায়নের স্বার্থে ২০২৯ সালের নির্বাচনের পূর্বেই নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে, এই বিলটি চলতি বছর থেকেই দেশব্যাপী একটি সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়ার সূচনা করবে। কমিশন যখন তার কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে, তখন '২০২৬ সালের সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়া'টিই এই দশকের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এটি আগামী প্রজন্মের জন্য ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুকে নতুন রূপে ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি বহন করছে।
















