আজকাল ওয়েবডেস্ক: সুপ্রিম কোর্টে সাবরীমালা মামলার শুনানি চলাকালীন এক হালকা মেজাজের মুহূর্ত তৈরি হল, যখন বিচারপতি বি.ভি. নাগরত্ন সরাসরি জানিয়ে দিলেন যে, 'হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি' থেকে আসা কোনও তথ্য বা জ্ঞান অন্তত দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। বৃহস্পতিবার নয় বিচারপতির এক সাংবিধানিক বেঞ্চে যখন ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিধি এবং বিভিন্ন ধর্মের নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সওয়াল-জবাব চলছিল, ঠিক তখনই এই মন্তব্যটি করেন তিনি। এই বেঞ্চের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
ঘটনাটির সূত্রপাত হয় যখন প্রবীণ আইনজীবী নীরজ কিষাণ কৌল সওয়াল করার সময় বলেন যে, জ্ঞান বা প্রজ্ঞা যে উৎস থেকেই আসুক না কেন, তা গ্রহণ করতে কোনও দ্বিধা থাকা উচিত নয়। তিনি কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুরের একটি প্রবন্ধের প্রসঙ্গ টানেন, যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস সংক্রান্ত বিষয়ে বিচারবিভাগীয় সংযমের কথা বলা হয়েছিল। আইনজীবী কৌল যুক্তি দেন, আমাদের সভ্যতা এতটাই সমৃদ্ধ যে যে কোনও দেশ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা তথ্যকে আমরা স্বাগত জানাতে পারি। এই রসবোধের রেশ টেনেই বিচারপতি নাগরত্ন হেসে বলেন, "কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি থেকে নয়।" বিচারপতির এই মন্তব্যে আদালত কক্ষে হাসির রোল ওঠে। আইনজীবী অবশ্য রসিকতার মধ্যে না গিয়ে জানান, তিনি তথ্যের উৎসের চেয়ে তথ্যের গুণগত মানের ওপর জোর দিতে চেয়েছেন।
তবে এই মজার মুহূর্তের আড়ালে ছিল এক গভীর আইনি বিতর্ক। আইনজীবী কৌল দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের প্রধানের পক্ষে লড়ছিলেন। তাঁর মূল যুক্তি ছিল, সংবিধানের ২৬(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় কার্যকলাপ পরিচালনার যে অধিকার রয়েছে, তাকে সবসময় ২৫(২)(খ) অনুচ্ছেদের আওতায় থাকা সমাজ সংস্কারমূলক আইনের মাধ্যমে দমন করা উচিত নয়। তিনি স্পষ্ট বলেন যে, জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা বা জনস্বাস্থ্যের বিষয় থাকলে আলাদা কথা, কিন্তু কোনও বিশেষ ধর্মীয় রীতিকে কেবল 'সমাজ সংস্কারের' দোহাই দিয়ে বদলে ফেলা যায় না।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে 'নৈতিকতা' বা 'মোরালিটি' শব্দটির ব্যাখ্যা। বিচারপতি আহসানউদ্দিন আমানুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন যে, পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেন এই ক্ষেত্রে 'সাংবিধানিক নৈতিকতা'র ধারণা প্রয়োগ করা যাবে না? জবাবে আইনজীবী কৌল সতর্ক করে বলেন, যদি প্রতিটি ধর্মীয় বিষয়ে সাংবিধানিক নৈতিকতা টেনে আনা হয়, তবে তা রচয়িতাদের মূল ভাবনার চেয়ে অনেক বেশি দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যাবে। তাঁর মতে, সামাজিক নৈতিকতা স্থির হতে পারে, কিন্তু আপত্তিকর কোনও প্রথা এমনিতেই জনস্বার্থের পরিপন্থী বলে গণ্য হয়, তার জন্য নতুন কোনও মানদণ্ড আমদানির প্রয়োজন নেই।
আদালত এদিন স্বীকার করে নিয়েছে যে, কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীর কোন প্রথাটি অপরিহার্য আর কোনটি গৌণ, তা বিচারবিভাগীয় মঞ্চে নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন, প্রায় অসম্ভব। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে এক ঐতিহাসিক রায়ে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী ঋতুমতী মহিলাদের সাবরীমালা মন্দিরে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়েছিল। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই বর্তমানে এই বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানি চলছে, যেখানে আগামী দিনে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও লিঙ্গ সাম্যের এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।















