আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের জাতীয় গান 'বন্দে মাতরম' গাওয়ার সময় বাধা সৃষ্টি করলে বা এর অবমাননা করলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। মোদি সরকারের পক্ষ থেকে সংসদের আসন্ন বর্ষাকালীন অধিবেশনে যে বিলটি পেশ করা হবে, তার মূল বিষয়বস্তু এটাই। 'জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ (সংশোধনী) বিল' পাস হলে জাতীয় সঙ্গীত, ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা এবং সংবিধানের মতো জাতীয় গান 'বন্দে মাতরম'-ও একই আইনি সুরক্ষা পাবে।

এই বিলের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের আইন সংশোধন হবে। ওই আইন অনুযায়ী, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় অবমাননা, বাধা সৃষ্টি বা বিশৃঙ্খলা তৈরির জন্য তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধানই রয়েছে। জাতীয় পতাকা ও সংবিধানের অবমাননার ক্ষেত্রেও একই শাস্তির ব্যবস্থা আছে। নতুন বিলের মাধ্যমে জাতীয় গানকেও এই আইনের আওতাভুক্ত করা হচ্ছে।

'বন্দে মাতরম' নিয়ে বিজেপির উদ্যোগ
জাতীয় সঙ্গীতের সার্ধশতবর্ষ (১৫০তম বর্ষ) বার্ষিকী উপলক্ষে বছরব্যাপী উদযাপনের অংশ হিসেবেই কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগ। গত কয়েক মাস ধরে সরকার জাতীয় গানকে নিজেদের ভাবমূর্তির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক রাজ্যগুলিকে নির্দেশ দিয়েছিল যে, যেসব সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত 'জনগণমন' বাজানো বা গাওয়া হয়, সেখানে জাতীয় গানও (বন্দে মাতরম) বাজানো বা গাওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।

সেই সময়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিজেপির এই পদক্ষেপকে মে মাসে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবে দেখেছিলেন। ১৮৭৫ সালে বাঙালি ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জি এই গানটি রচনা করেছিলেন। সাত বছর পর তাঁর 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে তা প্রথম প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে জিতে রাজ্যে তাদের প্রথম সরকার গঠন করে।

'দ্য হিন্দু'-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরুর দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক রাজ্যগুলিকে আরও একটি চিঠি পাঠায়। এতে বলা হয়, সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় গান (বন্দে মাতরম)- উভয়ই পরিবেশনের ক্ষেত্রে 'বন্দে মাতরম'-কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজ্যগুলির মুখ্য সচিবদের পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, "যখন জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় গান (বন্দে মাতরম) গাওয়া বা সুর বাজান হবে, তখন জাতীয় গানকেই (বন্দে মাতরম) প্রথমে গাওয়া বা বাজানো হবে।" চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জাতীয় গানের (বন্দে মাতরম) ছয়টটি স্তবকই (যার সময় প্রায় ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ড) গাইতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক যে "ছয়'টি স্তবকের" ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে, তার নেপথ্যে একটি কারণ রয়েছে।

১৯৩৭ সালে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস তাদের সভা-সমাবেশে 'বন্দে মাতরম'-এর কেবল প্রথম দু'টি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বিজেপির মতে, ওই গানের পরবর্তী স্তবকগুলোতে হিন্দু দেবীদের উল্লেখ থাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ এর বিরোধিতা করেছিল।

'কংগ্রেস বন্দে মাতরম-কে ঘৃণা করে'
বিজেপি প্রায়ই কংগ্রেসকে আক্রমণ করার জন্য এই বিষয়টি সামনে আনে। শুক্রবার, বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র শাহজাদ পুনাওয়ালা এই বিলের বিরোধিতা করার জন্য কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, "কংগ্রেস এবং তাদের বলয় (ইকোসিস্টেম) বন্দে মাতরম-কে ঘৃণা করে।"
পুনাওয়ালা অভিযোগ করেন যে, মুসলিম লিগের চাপে পড়ে নেহরু জাতীয় গানকে দুই ভাগে 'ভাগ' করেছিলেন। তিনি বলেন, "এমনকি যখন কেবল প্রথম দু'টি স্তবক গাওয়ার ব্যবস্থা ছিল, তখনও কংগ্রেস এবং তাদের অনেক নেতা তা গাইতে অস্বীকার করেছিলেন।"

গত বছর সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে 'বন্দে মাতরম' নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ হয়েছিল।

জাতীয় গান 'বন্দে মাতরম' বিষয়ক আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিযোগ করেছিলেন যে, তোষণ-নীতির জন্যই নেহরু 'বন্দে মাতরম'-এর ঐতিহ্যকে "ক্ষুণ্ণ" করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, ওই গানের স্তবকগুলো বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তই "ভারতের বিভাজনের বীজ বপন করেছিল"। এর মাধ্যমে তিনি ১৯৪৭ সালের দেশভাগের দিকে ইঙ্গিত করেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তব্যের জবাবে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে জানান, কেবল প্রথম কয়েকটি স্তবক ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো নেতারা সম্মিলিতভাবে নিয়েছিলেন।

আসন্ন সংসদ অধিবেশনে সরকার যখন 'বন্দে মাতরম' বিলটি পেশ করবে, তখন এই বিষয়টি নিয়ে আবারও উত্তেজনা তৈরি প্রায় অনিবার্য। বিজেপির দাবি, এই বিলের উদ্দেশ্য হল গানের মর্যাদাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া, পুরনো রাজনৈতিক বিবাদকে ফের উস্কে দেওয়া নয়।

অনেকেই মনে করছেন, আগামী সপ্তাহে এক উত্তাল অধিবেশন অপেক্ষা করছে।