আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের সূর্য কি তবে পশ্চিম গগনে? সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভি-ডেম’ (V-Dem) ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিকতম রিপোর্ট অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ‘ডেমোক্রেসি রিপোর্ট ২০২৬: আনর্যাভেলিং দ্য ডেমোক্রেটিক এরা’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক দেশের চেয়ে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার সংখ্যাই বেশি। ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বে এখন ৯২টি স্বৈরাচারী দেশ এবং ৮৭টি গণতান্ত্রিক দেশ রয়েছে। অর্থাৎ, গত ৫০ বছরের অর্জিত গণতান্ত্রিক সাফল্য কার্যত মুছে গিয়ে বিশ্ব এখন ১৯৭৮ সালের অবস্থায় ফিরে গিয়েছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারত এখনও ‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’ বা নির্বাচনী স্বৈরাচারী দেশের তকমা ঝেড়ে ফেলতে পারেনি। ২০১৭ সালে ভারত এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, যা ২০২৬-এর রিপোর্টেও অপরিবর্তিত। ১৭৯টি দেশের মধ্যে লিবারেল ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে ভারতের স্থান ১০৫— যা গত বছরের তুলনায় আরও পাঁচ ধাপ নিচে। রিপোর্টে ভারতের এই অবনতির পেছনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া, সরকারি নীতির সমালোচনা করা সাংবাদিকদের হেনস্থা এবং সংসদীয় নজরদারি কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলোকে দায়ী করা হয়েছে। সরাসরি শাসক দল বিজেপি এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির সমালোচনা করে বলা হয়েছে, হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা বিপন্ন হচ্ছে।
&t=1sতবে এই রিপোর্টের সবথেকে চমকপ্রদ তথ্য হলো আমেরিকার অবস্থান। গত ৫০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবার আমেরিকাকে আর ‘লিবারেল ডেমোক্রেসি’ বা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের তকমা দেওয়া হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনকালে আমেরিকা দ্রুত স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি এই তালিকায় নতুন সংযোজন হিসেবে ব্রিটেনের নামও উঠে এসেছে। বর্তমানে বিশ্বের ৭৪ শতাংশ মানুষ কোনও না কোনও ধরনের স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে বাস করছেন। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল পাঁচটি দেশের মধ্যে চারটিই (ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান) এখন স্বৈরাচারী বা নির্বাচনী স্বৈরাচারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত।
দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। এই অঞ্চলের মাত্র ২ শতাংশ মানুষ প্রকৃত নির্বাচনী গণতন্ত্রের স্বাদ পাচ্ছেন, যাঁদের বাস মূলত নেপাল ও শ্রীলঙ্কায়। শ্রীলঙ্কা এই অঞ্চলের একমাত্র দেশ যেখানে গণতন্ত্রের কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। অন্যদিকে আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মতো দেশগুলো ‘ক্লোজড অটোক্রেসি’র পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশও এই নিচের দিকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ভি-ডেমের এই রিপোর্ট স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ এবং নাগরিক সমাজের ওপর দমনপীড়ন এখন স্বৈরাচারী সরকারগুলোর প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত ও আমেরিকার মতো বৃহৎ গণতন্ত্রের এই পিছুহটা বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
