আজকাল ওয়েবডেস্ক: শতবার্ষিকী বছরটিকে একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। এই সুযোগের মাধ্যমে তারা পশ্চিমী বিশ্বের কাছে পৌঁছাতে মরিয়া। আরএসএস ও ভারত সম্পর্কে প্রচলিত "বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার" ও দীর্ঘদিনের ভুল ধারণাগুলোর মোকাবিলা করতে চায় এই সংগঠন। এমনই জানিয়েছেন, সংঘের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে। বর্তমানে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে মনার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে রয়েছেন হোসাবলে।

'ইন্ডিয়া টুডে'-র রোহিত শর্মাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোসাবলে এই উদ্যোগের সময়কাল সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বিশ্বে ঘটে চলা ঘটনাবলি এবং বিভিন্ন আলোচনার প্রেক্ষাপটে আরএসএস-এর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আরও সক্রিয়ভাবে তুলে ধরা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

দত্তাত্রেয় হোসাবলে বলেন, "সাম্প্রতিক অতীতে সংঘ সম্পর্কে নানা ভিন্ন ভিন্ন মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। এমনকি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতিও রাষ্ট্রসংঘে তাঁর ভাষণে সুনির্দিষ্টভাবে সংঘের নাম উল্লেখ করেছিলেন। আমরা অনুভব করেছি যে, এখন সময় এসেছে- বিশ্বের সামনে সংঘের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরার এবং বর্তমানে যে ধরনের বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে, তার উপযুক্ত জবাব দেওয়ার।"

সংঘের সাধারণ সম্পাদকের এই সফর ওয়াশিংটন ডিসিতে ভারতীয় সরকারি প্রতিনিধিদলের ব্যাপকতর কূটনৈতিক তৎপরতার অন্তর্ভুক্ত। সেখানে বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।

হোসাবলে বলেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য কেবল আরএসএস সম্পর্কেই নয়, বরং খোদ ভারত সম্পর্কেও আন্তর্জাতিক মহলে প্রচলিত ধারণাগুলোকে সংশোধন করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ভারতের সভ্যতাগত গভীরতা এবং দেশটির অবদানকে কোনওভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর বিভিন্ন আলাপ-আলোচনার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে হোসাবলে জানান, আরএসএস-এর সমাজসেবামূলক কাজের ব্যাপকতা সম্পর্কে জানতে পেরে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "আমরা যখন মানুষের কাছে সংঘের সেবামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে বলি, তখন তারা রীতিমতো হতবাক হয়ে যান।" এ প্রসঙ্গে তিনি 'একল বিদ্যালয়' এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সংগঠনটির কাজের একটি বিশাল অংশই সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে থেকে যাচ্ছে। তাঁর কথায়, "সংঘের কাজের যে অংশটুকু দেখা যায়, তা আসলে মোট কাজের মাত্র ১০ শতাংশ। বাকি ৯০ শতাংশ কাজ সম্পর্কে জানতে পেরে মানুষ প্রায়শই নতুন এক সত্যের মুখোমুখি হন।"

হোসাবলে আরও বলেন, আরএসএস কেবল কুচকাওয়াজ, মিছিল-মিটিং কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সাধারণ মানুষের মনে আরএসএস সম্পর্কে এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে। অথচ এর বিশাল স্বেচ্ছাসেবক-চালিত সেবামূলক নেটওয়ার্ক মানুষের দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়। হোসাবলে প্রজন্মগত ভুল ধারণাগুলোর দিকেও ইঙ্গিত করেন এবং উল্লেখ করেন যে, কেউ কেউ এই সংগঠনটিকে সেকেলে বা আধুনিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কহীন হিসেবে দেখে থাকেন। তিনি বলেন, "কেউ কেউ এই ধারণাগুলোকে 'আধুনিক মূল্যবোধের' পরিপন্থী হিসেবে দেখে থাকেন। তবে, সত্যের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্কই নেই," তিনি মন্তব্য করেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে, "আরএসএস-এর সদস্যরা প্রযুক্তি ও সমসাময়িক ধ্যানধারণার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।"

আরএসএস সংখ্যালঘুদের বিরোধী কিংবা আধিপত্যবাদী মতাদর্শের অনুসারী, এমন সমালোচনার জবাবে হোসাবালে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক আলোচনায়  যেসব অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন, সেগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, এ ধরনের বয়ান বা আখ্যান সময়ের ব্যবধানে গড়ে উঠেছে এবং তা এই সংগঠনের প্রকৃত দর্শনকে প্রতিফলিত করে না। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, হিন্দু সাংস্কৃতিক চিন্তাধারা একতা ও সংহতির বোধকে উৎসাহিত করে এবং কোনও প্রকার আধিপত্যবাদকে সমর্থন করে না।

আরএসএস এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদীয়মান রক্ষণশীল আন্দোলনগুলোর (যেমন- প্রয়াত ডানপন্থী নেতা চার্লি কার্ক প্রতিষ্ঠিত 'টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ') মধ্যে যে তুলনা করা হয়, হোসাবালে সেই সমান্তরাল বা সাদৃশ্যকে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি, "সংঘ নিজেকে একটি অনন্য সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। প্রতিটি দেশ এবং প্রতিটি কার্যপদ্ধতিই স্বতন্ত্র, সংঘও তার নিজস্ব স্বতন্ত্র কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করে।" একটি রূপক ব্যবহার করে তিনি আরও বললেন, "আকাশের তুলনা কেবল আকাশের সঙ্গেই চলে; সাগরের তুলনা কেবল সাগরের সঙ্গেই।"

হোসাবালে জোর দিয়ে বললেন যে, আমেরিকান সমাজের প্রতি তাঁর বার্তা হল - ভারতের সভ্যতাগত প্রেক্ষাপটকে আরও ভালোভাবে অনুধাবন করা।  তিনি বললেন, "আপনাদের অবশ্যই ভারতকে সঠিকভাবে বুঝতে হবে। এটি পাঁচ হাজার বছরের বিস্তৃত এক সভ্যতা। ভারত এমন কোনও দেশ নয় যাকে উপেক্ষা করা চলে," তিনি আরও যোগ করেন," ভারত যদিও বিশ্বব্যাপী বন্ধুত্ব প্রত্যাশা করে, তবুও বন্ধুত্ব কখনওই একতরফা বিষয় হতে পারে না।"

আরএসএস-এর এই নেতা, সংগঠনটিকে ভারতের সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত চেতনার গভীরে প্রোথিত একটি স্বেচ্ছাসেবক-চালিত আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, "বর্তমান এই জনসংযোগের উদ্দেশ্য হল - ধারণা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান দূর করা।"