আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ব্রিটিশ স্থপতি Edwin Lutyens-এর আবক্ষ মূর্তি অপসারণ করে ‘ডিকলোনাইজেশন’-এর বার্তা দিতে চেয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু একই সময়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক (MoD) যখন শীর্ষ সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক কর্তাদের জন্য নতুন এক্সিকিউটিভ জেট কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের স্মারক ভাঙা গেলেও কি ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ আকাশপথের ঐতিহ্য সত্যিই বদলেছে?
দ্যা ওয়্যার-এর প্রতিবেদন অনুসারে, শিল্পমহলের সূত্রে জানা গেছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সম্প্রতি ভারতীয় বায়ুসেনার (IAF) ‘পেগাসাস’ এয়ার হেডকোয়ার্টার্স কমিউনিকেশন স্কোয়াড্রন (AHCS)-এর জন্য ব্যবহৃত সেকেন্ডারি ভিআইপি এয়ারলিফট সক্ষমতা আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশি ও বিদেশি সংস্থাগুলির কাছে ‘রিকোয়েস্ট ফর ইনফরমেশন’ (RfI) পাঠানো হয়েছে। উদ্দেশ্য—প্রায় দুই দশক আগে অন্তর্ভুক্ত এক্সিকিউটিভ জেটগুলির পরিবর্তে নতুন প্রজন্মের বিজনেস জেট সংগ্রহ।
এই স্কোয়াড্রন দিল্লির পালাম ঘাঁটি থেকে পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাইরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের শীর্ষ আমলা, সেনা, নৌ ও বায়ুসেনা প্রধানসহ উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের পরিবহন করে। অর্থাৎ, সামরিক নেতৃত্বের জন্য একটি পৃথক, উচ্চ-সুবিধাসম্পন্ন বিমানবহর বজায় রাখার ঐতিহ্যই এখানে অব্যাহত থাকছে।
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে বৈসাদৃশ্য নিয়ে। যেখানে সামনের সারির যুদ্ধবিমানগুলি ৩০-৪০ বছর, কখনও ৫০ বছর পর্যন্ত পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে তুলনামূলকভাবে কম চাপের প্রোফাইলে উড়ে চলা এক্সিকিউটিভ জেটগুলি ২০-২২ বছরের মাথায় বদলের মুখে।
সোভিয়েত যুগের Mikoyan-Gurevich MiG-21 প্রায় ছয় দশক পরিষেবা দেওয়ার পর অবসর নিয়েছে। SEPECAT Jaguar, যা ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, আজও আপগ্রেড হয়ে উড়ছে। Dassault Mirage 2000, Mikoyan MiG-29 এবং Sukhoi Su-30MKI—সবকটিই দীর্ঘদিনের অপারেশনাল চাপ সহ্য করে এখনও পরিষেবায় রয়েছে, নিয়মিত আধুনিকীকরণের মাধ্যমে।
অন্যদিকে, ২০০৫ সালে অন্তর্ভুক্ত ব্রাজিলে তৈরি Embraer Legacy 600 এক্সিকিউটিভ জেট—যেগুলি মূলত শীর্ষ আমলা ও সামরিক কর্তাদের বহন করে—এখন বদলের অপেক্ষায়।
এক প্রাক্তন বায়ুসেনা আধিকারিকের কথায়, “যুদ্ধবিমানগুলিকে সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়, কাঠামোগত শক্তিবৃদ্ধি ও আপগ্রেডের মাধ্যমে তাদের আয়ু বাড়ানো হয়। কিন্তু শীর্ষ কর্তাদের বহনকারী জেট দ্রুত বদলানো হয়। এই অগ্রাধিকারের পার্থক্য নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়।”
গত জানুয়ারিতে মহারাষ্ট্রের বারামতিতে একটি বেসরকারি Learjet 45XR দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই নতুন জেট সংগ্রহের প্রক্রিয়া দ্রুত করা হয়েছে বলে জানা যায়।
তবে সমালোচকদের যুক্তি—বায়ুসেনার প্রায় সব যুদ্ধবিমানই গত কয়েক দশকে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। Mikoyan-Gurevich MiG-21-এর ক্ষেত্রেই ৪০০-র বেশি দুর্ঘটনার নজির রয়েছে। তবু সেগুলিকে অবিলম্বে সরিয়ে না দিয়ে আপগ্রেডের মাধ্যমে দীর্ঘায়ু দেওয়া হয়েছে।
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার?
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও আলোচনায় এসেছে। ব্রিটিশ আমলে ভাইসরয় ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক বিমান ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। ১৯৪৭ সালের জানুয়ারিতে রয়্যাল ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স একটি কমিউনিকেশন স্কোয়াড্রন গঠন করে ভিআইপি পরিবহনের জন্য। স্বাধীনতার পর সেটিই এএইচসিএস-এ রূপান্তরিত হয়—ঐতিহ্য ও পরিকাঠামোসহ।
পরবর্তী দশকগুলিতে ভিআইপি বহর আধুনিক হয়েছে। ২০০৯ সালে বিশেষ কনফিগারেশনের Boeing 747-400 অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০২০ সালে তার জায়গায় আসে অত্যাধুনিক Boeing 777-300ER, উন্নত সুরক্ষা ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ। রোটারি উইং বিভাগে বর্তমানে পরিবর্তিত Mil Mi-17V5 হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয় ভিভিআইপি পরিবহনে। একসময় ইতালির AgustaWestland AW101 হেলিকপ্টার কেনার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাতিল হয়।
রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে Edwin Lutyens-এর মূর্তি সরানো প্রতীকী পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু আকাশপথে ক্ষমতার শীর্ষস্তরের জন্য পৃথক, সুরক্ষিত ও আরামদায়ক করিডর বজায় রাখার নীতি যে অটুট—সাম্প্রতিক উদ্যোগ সেই বার্তাই বহন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একজন অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিকের কথায়, “স্মারক ভাঙা সহজ। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে থেকে যাওয়া অগ্রাধিকারের মানসিকতা বদলানো কঠিন।”
