আজকাল ওয়েবডেস্ক: অষ্টম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বই ঘিরে নজিরবিহীন কড়া পদক্ষেপ নিল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) শীর্ষ আদালত National Council of Educational Research and Training (এনসিইআরটি) প্রকাশিত পাঠ্যবইটির উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের স্কুল শিক্ষা বিভাগের সচিব ও এনসিইআরটি-র পরিচালকের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত-এর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি এম পাঞ্চোলি। আদালত প্রাথমিকভাবে পর্যবেক্ষণ করে জানায়, সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের বিষয়বস্তু “গুরুতর অসদাচরণ”-এর পর্যায়ে পড়তে পারে। যদি প্রমাণিত হয় যে বিচারব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করার উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছে, তবে আদালত অবমাননা আইন বা অন্যান্য আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
বেঞ্চ স্পষ্ট নির্দেশ দেয়—বইটির আর কোনও মুদ্রণ, পুনর্মুদ্রণ বা ডিজিটাল প্রচার চলবে না। ইতিমধ্যে ছাপা হওয়া সব কপি বাজেয়াপ্ত করে জনসমক্ষে থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এনসিইআরটি কেন্দ্র ও রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে গুদাম, বিপণন কেন্দ্র ও স্কুল—সব জায়গা থেকে বইয়ের মুদ্রিত ও সফট কপি উদ্ধার করবে এবং তা সিল করে দেবে। দুই সপ্তাহের মধ্যে আদালতে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।
আদালত জানিয়েছে, এই নির্দেশ কার্যকর করার ব্যক্তিগত দায় থাকবে এনসিইআরটি-র পরিচালক এবং যেসব স্কুলে বই পৌঁছেছে সেখানকার প্রধান শিক্ষকদের উপর। সংশ্লিষ্ট বইয়ের ভিত্তিতে কোনও পাঠদানও চলবে না। বেঞ্চ সতর্ক করে দেয়, ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বা নাম বদলে বইটি ছড়ানোর চেষ্টা করা হলে তা আদালতের নির্দেশ অমান্য হিসেবে গণ্য হবে।
এছাড়া, সংশ্লিষ্ট অধ্যায়টি কারা রচনা করেছেন, তাঁদের নাম ও যোগ্যতার বিবরণ এবং যে বৈঠকে বিষয়বস্তু চূড়ান্ত হয়েছে তার কার্যবিবরণী আদালতে পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুনানির সময় আদালত এনসিইআরটি-র পূর্ববর্তী জবাবের ভাষা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, অধ্যায়টিতে বিচারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যাতে নিষ্ক্রিয়তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এবং প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি বা আর গাভাই-এর মন্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। বেঞ্চের মতে, এতে “প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা খর্ব করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা”-র ইঙ্গিত মিলছে।
তবে একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করে দেয় যে, তারা বৈধ সমালোচনা স্তব্ধ করতে চায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিচারব্যবস্থা-সহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পর্যালোচনা নাগরিকের অধিকার—এ কথা বেঞ্চ উল্লেখ করে।
শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান, অধ্যায়টি ইতিমধ্যেই প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং মাত্র ৩২টি কপি বাজারে গিয়েছিল, সেগুলি উদ্ধার করা হবে। এনসিইআরটি দুঃখপ্রকাশ করেছে এবং যাঁরা অধ্যায়টির পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, তাঁদের ভবিষ্যতে সংস্থার সঙ্গে যুক্ত রাখা হবে না বলেও তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, “বিচারে বিলম্ব মানেই বিচার অস্বীকার করা”—শীর্ষক আরেকটি অধ্যায়ে মামলার জট নিয়ে ভুল তথ্য ছিল।
প্রধান বিচারপতি অবশ্য মন্তব্য করেন, সরকারি বিবৃতিতে স্পষ্ট ক্ষমাপ্রার্থনার অভাব রয়েছে। তাঁর কথায়, “গুলি ছোঁড়া হয়েছে, বিচারব্যবস্থা আজ রক্তাক্ত।” তিনি ঘটনাটিকে “গভীরমূল ও সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র” বলে অভিহিত করে জানান, দায়ীদের চিহ্নিত করতেই হবে। এদিকে প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল আদালতকে জানান, অধ্যায়টির সফট কপি ইতিমধ্যেই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে বিচারপতি বাগচি কেন্দ্রকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর, যেখানে বলা হয় নতুন পাঠ্যবইয়ে বিচারব্যবস্থার সামনে দুর্নীতি ও মামলার জটকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রবীণ আইনজীবীরা আদালতে উদ্বেগ প্রকাশ করলে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা গ্রহণ করে।
আদালতের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর এনসিইআরটি এক বিবৃতিতে জানায়, অধ্যায়টি আবার লেখা হবে এবং ২০২৬–২৭ শিক্ষাবর্ষে সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশিত হবে। তারা জানায়, বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্তি ছিল “অনিচ্ছাকৃত ভুল সিদ্ধান্ত”-এর ফল এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি তাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রয়েছে। সংস্থার দাবি, নতুন পাঠ্যবইয়ের লক্ষ্য সাংবিধানিক জ্ঞান, প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বাড়ানো—কোনও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব খর্ব করা নয়।
