আজকাল ওয়েবডেস্ক: মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি হলো শনিবার, ৩১ জানুয়ারি। প্রয়াত এনসিপি সভাপতি ও উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের স্ত্রী সুনেত্রা পাওয়ার শপথ নিলেন রাজ্যের প্রথম মহিলা উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। রাজ্য এনসিপি বিধায়ক দলের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর রাজভবনের লোক ভবনে এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে রাজ্যপাল আচার্য দেবব্রত তাঁকে পদ ও গোপনীয়তার শপথবাক্য পাঠ করান। নতুন দায়িত্বে তাঁকে আবগারি (Excise) দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই রাজনৈতিক রদবদল আসে অজিত পাওয়ারের আকস্মিক মৃত্যুর মাত্র তিন দিনের মাথায়। ২৮ জানুয়ারি বারামতিতে এক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় মহাযুতি সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের। তাঁর মৃত্যুর পর মহারাষ্ট্রের শাসক জোট এবং এনসিপির ভেতরে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সুনেত্রা পাওয়ারের শপথ সেই প্রেক্ষিতেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস, উপ-মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে, এনসিপির শীর্ষ নেতা প্রফুল্ল প্যাটেল, সুনীল তাটকরে ও ছগন ভুজবল। সুনেত্রা পাওয়ারের ছোট ছেলে জয় পাওয়ার ও তাঁর স্ত্রীও অনুষ্ঠানে ছিলেন।
৬২ বছর বয়সি সুনেত্রা পাওয়ার সম্প্রতি রাজ্যসভা সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি রাজ্য বিধানসভার কোনও কক্ষের সদস্য নন। রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা, খুব শীঘ্রই তিনি প্রয়াত অজিত পাওয়ারের আসন বারামতি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে উপনির্বাচনে লড়তে পারেন।
যদিও তিনি একটি প্রবল রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য, দীর্ঘদিন সুনেত্রা পাওয়ার ছিলেন তুলনামূলকভাবে নীরব ও পর্দার আড়ালের চরিত্র। তাঁর সক্রিয় নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ ঘটে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে, যখন তিনি বারামতিতে নিজের ননদ, এনসিপি (শরদচন্দ্র পাওয়ার) গোষ্ঠীর সাংসদ সুপ্রিয়া সুলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেই লড়াই রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, সুনেত্রা পাওয়ার তখনও রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন না।
এখন, মহারাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর একটির ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন মহাযুতি সরকারের ‘নম্বর টু’ পদে তাঁর উত্থান এনসিপির জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এই অধ্যায় মোটেই সহজ নয়। একদিকে তাঁকে বিজেপি ও একনাথ শিন্ডে নেতৃত্বাধীন শিবসেনার সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকার চালাতে হবে, অন্যদিকে এনসিপির ভাঙা সংগঠনকে একত্রে ধরে রাখার কঠিন দায়িত্বও তাঁর কাঁধে।
সুনেত্রা পাওয়ারের সামনে সবচেয়ে বড় ও তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো—অজিত পাওয়ার গোষ্ঠীর এনসিপি এবং শরদ পাওয়ারের নেতৃত্বাধীন এনসিপি (এসপি)-র মধ্যে বহুল আলোচিত সম্ভাব্য একীভবন নিয়ে কী অবস্থান নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত।
মারাঠওয়াড়ার ধারাশিব জেলার (সাবেক ওসমানাবাদ) তেরা গ্রামের বাসিন্দা সুনেত্রা পাওয়ার রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও দীর্ঘদিন সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। তাঁর ভাই পদ্মসিং পাটিল এনসিপির একজন প্রবীণ নেতা। ১৯৯৯ সালে শরদ পাওয়ার প্রতিষ্ঠিত এনসিপি ভেঙে যায় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে, যখন অজিত পাওয়ার বিজেপি ও শিবসেনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মহাযুতি সরকারে যোগ দেন। এরপর ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মহাযুতি জোটের বিপুল জয়ের পর দেবেন্দ্র ফড়ণবীসের নেতৃত্বাধীন সরকারেও অজিত পাওয়ার উপ-মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
এদিনের শপথগ্রহণ ঘিরে আরেকটি রাজনৈতিক ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য আসে শরদ পাওয়ারের তরফে। বারামতিতে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, সুনেত্রা পাওয়ারের শপথগ্রহণ সম্পর্কে তিনি আগাম কিছুই জানতেন না। “আমরা শপথগ্রহণের বিষয়ে কিছুই জানতাম না। খবরের কাগজ ও সংবাদমাধ্যম থেকেই বিষয়টি জানতে পেরেছি। এই শপথগ্রহণ নিয়ে আমার কোনও ধারণা ছিল না,”—বলেন শরদ পাওয়ার।
এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দেয়, অজিত পাওয়ারের মৃত্যুর পরও এনসিপির দুই শিবিরের দূরত্ব এখনও কাটেনি। সেই টানাপোড়েনের মাঝেই সুনেত্রা পাওয়ারের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হলো—যেখানে ব্যক্তিগত শোক, দলীয় সংকট ও জোট রাজনীতির চাপ একসঙ্গে সামলানোই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
