আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের  চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে ভারতের অর্থনীতিতে। যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে, আর তার সরাসরি ধাক্কা লেগেছে টাকা, শেয়ারবাজার এবং তেলের দামে। শুক্রবার (১৩ মার্চ) ভারতীয় টাকা মার্কিন ডলারের তুলনায় ২০ পয়সা পড়ে ইতিহাসে সর্বনিম্ন ৯২.৪৬-এ পৌঁছেছে। এর আগের দিনই টাকা ৯২.৩৫৭৫-এ নেমে গিয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করায় ভারতের বৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার ফলে বাজারে আতঙ্ক বাড়ছে।

একই সঙ্গে শেয়ারবাজারেও বড় ধাক্কা লেগেছে। সপ্তাহজুড়ে প্রধান সূচকগুলির পতন হয়েছে পাঁচ শতাংশের বেশি, যা প্রায় ছয় বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতন। BSE Sensex সপ্তাহের শেষে ১.৯৩ শতাংশ কমে ৭৪,৫৬৩.৯২–এ দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে Nifty 50 ২.০৬ শতাংশ পড়ে ২৩,১৫১.১০–এ নেমে এসেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ২০২০ সালের মে মাসে কোভিড মহামারির অনিশ্চয়তার সময়ের পর এটিই সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতন। এই অস্থিরতার প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে Brent crude–এর দাম আবারও ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে চলে যায়। ভারতের মতো দেশে এটি বড় উদ্বেগের কারণ, কারণ দেশের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়।

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে ইরান, কাতার, এবং  সংযুক্ত আরব আমিরশাহী–এর মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক অঞ্চলের বেশ কিছু রিফাইনারি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে ভারতের অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে। বিনিয়োগ সংস্থা মিরা মানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা আনন্দ রাঠী বলেন, ভারতের তেলের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি—প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ। ফলে তেলের দাম বাড়তে থাকলে দেশের রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে জিডিপি বৃদ্ধির ওপরও।

&t=1s

এই পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে দ্রুত টাকা তুলে নিচ্ছেন। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের শেয়ার বিক্রি করেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারও কমতে শুরু করেছে। আরবিআই–এর তথ্য অনুযায়ী, ৬ মার্চ শেষ হওয়া সপ্তাহে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার কমে দাঁড়িয়েছে ৭১৬.৮১ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৭২৮.৪৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক সপ্তাহেই প্রায় ১১.৬৮ বিলিয়ন ডলার কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, টাকার পতন ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রি করায় এই পতন হয়েছে।

এর মধ্যেই রান্নার গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংসদে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরি জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও দেশে Liquefied Petroleum Gas (এলপিজি)–এর কোনও ঘাটতি নেই। তবে বাস্তবে অনেক জায়গায় গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজধানীতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। দিল্লি পুলিশ তাদের কর্মীদের নিয়মিত ছুটি বাতিল করে গ্যাস গুদাম, দোকান এবং রিফিলিং স্টেশনের বাইরে ২৪ ঘণ্টা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং তেলের দাম আরও বাড়ে, তাহলে ভারতের মুদ্রাস্ফীতি, বাণিজ্য ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।