আজকাল ওয়েবডেস্ক: আমাদের সকলের মনে একজন নেতার একটি নির্দিষ্ট ছবি আঁকা থাকে। তিনি টেবিলের শীর্ষে বসেন। দলগত ছবিতে থাকেন ঠিক মাঝখানে। তাঁর জন্য থাকে আলাদা একটি চেয়ার—সম্মানের আসন—যা তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তোলে। এই প্রতীকটাই যেন আমরা দেখতে অভ্যস্ত।
কিন্তু যদি কোনও নেতা নিজেই সেই প্রতীকটি নীরবে সরিয়ে দেন?
এটি কোনও ভাষণ বা বড় ব্যবসায়িক চুক্তির গল্প নয়। এটি ব্যস্ত এক ঘরে কেটে যাওয়া এক নীরব মিনিটের গল্প—একটি খালি চেয়ার দিয়ে যার শুরু। ভাবুন, এক কক্ষে ৫২ জন তরুণ-তরুণী। নতুন ম্যানেজার, সদ্য বিজনেস স্কুল থেকে পাশ করে ভারতের অন্যতম সম্মানিত শিল্পগোষ্ঠীতে কর্মজীবন শুরু করতে চলেছেন। তারা মাত্র এক ঘণ্টা কাটিয়েছেন তাঁদের সবার শ্রদ্ধার মানুষ রতন টাটার সঙ্গে। অনেকের জন্য এটাই তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ। আর তাঁর জন্য এটি ছিল চেয়ারম্যান হিসেবে শেষ দিকের একটি অনুষ্ঠান।
ঘরে উত্তেজনার আবহ। স্মৃতি ধরে রাখতে একজন ফটোগ্রাফার এগিয়ে এলেন। দক্ষ হাতে সারি করে দাঁড় করালেন সবাইকে। সামনের সারির ঠিক মাঝখানে রাখা হলো একটি একক চেয়ার—অতিথি সম্মানের স্পষ্ট আসন। মঞ্চ প্রস্তুত।
রতন টাটা ঘরে ঢুকে সব দেখলেন—হাসিমুখ তরুণদের সারি, আর মাঝখানের খালি চেয়ার। তিনি থামলেন না, দ্বিধাও করলেন না। শান্ত ভঙ্গিতে তিনি চেয়ারটি তুলে নিয়ে ফ্রেমের বাইরে সরিয়ে রাখলেন। তারপর সামনের সারিতে এসে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসলেন, যাতে তিনি পাশে থাকা তরুণদের সমান উচ্চতায় থাকেন।
চারদিক থেকে আপত্তির স্বর উঠল, “স্যার, না স্যার!”
তিনি শুধু মৃদু হেসে হাত নাড়লেন—যেন বললেন, “এটাই ঠিক।” সেই মুহূর্তে ছবির অর্থ বদলে গেল। এটি আর একজন মহান ব্যক্তির আলাদা করে বসার ছবি রইল না। এটি হয়ে উঠল একজন মহান মানুষের সবার সঙ্গে থাকার ছবি।
এই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন টনি সেবাস্টিয়ান, সেই ব্যাচেরই একজন। এক দশকের বেশি সময় পর তিনি স্বীকার করেন—সেদিন কী পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, তা হয়তো আর মনে নেই। কিন্তু সেই দৃশ্যটি তিনি কখনও ভুলতে পারেননি। শিল্পজগতের এক মহীরুহ সিংহাসন ছেড়ে মাটিতে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—এই ছবিটিই তাঁর মনে গেঁথে আছে।

কেন এমন ছোট একটি কাজ এত গভীর ছাপ ফেলে?
কারণ এটি কোনও বড় ঘোষণা নয়, ছিল চরিত্রের প্রকাশ। এটি শেখায়—নেতৃত্ব মানে উপরে থাকা নয়, পাশে থাকা। সম্মান দাবি করে নেওয়া যায় না; অর্জন করতে হয় আচরণ দিয়ে। আপনি কোথায় বসছেন তা নয়, আপনি কীভাবে অন্যদের সঙ্গে দাঁড়াচ্ছেন—সেটাই আসল।
আজকের পৃথিবী আমাদের বলে—আরও ওপরে উঠো, আলোয় থাকো, অফিস দখল করো। সেই বাস্তবতায় এই ঘটনাটি এক নীরব বার্তা দেয়—নম্রতার শক্তিই আসল শক্তি। নিজেকে খুব বড় না ভাবলেও, বড় হওয়া যায়।
সেদিনের ছবিটি এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। ঘরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি সামনেই আছেন, কিন্তু ছবির প্রকৃত বিষয় সেই অদৃশ্য কাজ—একটি চেয়ার সরিয়ে দেওয়া। একটি প্রতীক ভেঙে ফেলা। একটি দূরত্ব মুছে ফেলা। খালি হয়ে যাওয়া সেই জায়গাটিতেই জন্ম নেয় সত্যিকারের নেতৃত্বের উত্তরাধিকার। কখনও কখনও নেতার সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা হল—দলের সঙ্গে মাটিতে বসে পড়া।
