আজকাল ওয়েবডেস্ক: বুধবার সংসদ ভবন চত্বরে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ও কেন্দ্রীয় রেল প্রতিমন্ত্রী রাভনীত সিং বিত্তুর মধ্যে তীব্র কথার লড়াইকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাহুল গান্ধী তাঁর প্রাক্তন সহযোগী বিত্তুকে প্রকাশ্যে “দেশদ্রোহী” বলে কটাক্ষ করতেই শুরু হয় এই বিতর্ক, যা পরে বিজেপি পর্যন্ত গড়ায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সংসদ চত্বরে হঠাৎই দু’জনের মুখোমুখি দেখা হয়। তখন বিত্তুর দিকে ইঙ্গিত করে রাহুল গান্ধী মন্তব্য করেন, “এই যে এক দেশদ্রোহী হেঁটে যাচ্ছে, ওর মুখটা দেখুন।” ২০২৪ সালে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে রাহুল আরও বলেন, “হ্যালো ভাই, আমার দেশদ্রোহী বন্ধু। চিন্তা কোরো না, তুমি আবার ফিরে আসবে (কংগ্রেসে)।”—এই কথা বলেই তিনি করমর্দনের জন্য হাত বাড়ান।

তবে রাহুলের দিকে হাত বাড়াননি বিত্তু। পরে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি কংগ্রেসের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিত্তুর অভিযোগ, “ওরা মনে করে দেশপ্রেমের একমাত্র ঠিকাদার তারাই। কংগ্রেস নেতারা নিজেদেরই দেশের রাজা বলে ভাবেন।”

এখানেই থামেননি বিত্তু। তিনি পুরনো ক্ষত উসকে দিয়ে বলেন, ১৯৯১ সালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হত্যার পর কংগ্রেস তাঁকে ‘শহিদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, কিন্তু তাঁর দাদু, প্রাক্তন পঞ্জাব মুখ্যমন্ত্রী সর্দার বেয়ান্ত সিংয়ের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। উল্লেখ্য, সন্ত্রাসবাদ দমনের সময় ১৯৯২ সালে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন বেয়ান্ত সিং।

পরে আরও কড়া ভাষায় বিত্তু বলেন, রাহুল গান্ধীর সঙ্গে হাত না মেলানোর কারণ তাঁর কাছে কংগ্রেস ও গান্ধী পরিবার “দেশের শত্রু” এবং শিখদের “খুনি”। তিনি ১৯৮৪ সালের অপারেশন ব্লু স্টারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “আমাদের সবচেয়ে পবিত্র গুরুদ্বার, গুরু গ্রন্থ সাহিবকে গুলি করা হয়েছিল। পাঞ্জাবি ও শিখদের হত্যা করা হয়েছিল, আমাদের মা-বোনদের হত্যা করা হয়েছিল।”

&t=2s

বিত্তুর পাশে দাঁড়িয়ে বিজেপিও রাহুল গান্ধীর মন্তব্যের নিন্দা করে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি, মঞ্জিন্দর সিং সিরসা ও অরবিন্দর সিং লাভলি—এই তিন শিখ নেতা সাংবাদিক বৈঠক করে রাহুলের বক্তব্যকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে আখ্যা দেন। হরদীপ সিং পুরি বলেন, “এই মানসিকতা উদ্বেগজনক। রাহুল গান্ধী যদি বিত্তুর দলবদল নিয়ে ক্ষুব্ধ হন, তবে তিনি বলতে পারতেন—‘বন্ধু, বহুদিন পর দেখা, তুমি ফিরে আসবে।’ কিন্তু কাউকে ‘দেশদ্রোহী’ বলা এবং প্রকাশ্যে অপমান করা একেবারেই ঠিক নয়।”

এর মধ্যেই দিনভর উত্তেজনার আবহে রাহুল গান্ধী বিজেপি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক হন। সংসদ ভবন চত্বরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি ২০২০ সালের ভারত–চিন সীমান্ত সংঘর্ষ, বিশেষ করে কৈলাস রেঞ্জের ঘটনাকে সামনে এনে প্রধানমন্ত্রীকে কাঠগড়ায় তোলেন। রাহুলের দাবি, প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নারাভানের একটি অপ্রকাশিত স্মৃতিকথা তিনি সংসদে পড়তে চান, কিন্তু সোমবার থেকে তাঁকে তা করতে দেওয়া হয়নি।

রাহুল বলেন, “আমি মনে করি না প্রধানমন্ত্রী আজ লোকসভায় আসার সাহস করবেন। কারণ তিনি এলে আমি এই বইটা তাঁকে দিতে চাই। এই বই প্রধানমন্ত্রী ও দেশকে সত্যটা জানতে সাহায্য করবে।”

সব মিলিয়ে, সংসদের বাইরে এই কথার লড়াই শুধু ব্যক্তিগত বিরোধে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে পুরনো রাজনৈতিক ক্ষত, দলবদল, দেশপ্রেমের সংজ্ঞা এবং ১৯৮৪ ও ১৯৯০-এর দশকের বিতর্কিত ঘটনাগুলি নতুন করে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।