আজকাল ওয়েবডেস্ক: উত্তরপ্রদেশের বছর কুড়ির এক কুইয়ার তরুণী স্বেচ্ছায় বৈবাহিক বাড়ি ছেড়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার পর ফতেপুর বেরি থানায় তৈরি হয় তীব্র উত্তেজনা। থানার ভিতরে নিজের বক্তব্য নথিভুক্ত করতে গেলে বাইরে জড়ো হয় ডানপন্থী সংগঠন Bajrang Dal–এর কর্মী-সমর্থকরা। আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, তারা উত্তেজক স্লোগান দেয়, হুমকি ও শারীরিক হামলা চালায় এবং তরুণীকে “ধর্মান্তর” করানো হচ্ছে বলে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলে।

তরুণীর দাবি, চার বছর আগে তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয় এবং বিয়ের পর থেকে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির তরফে শারীরিক, যৌন ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। নিজের লিখিত ও ভিডিও বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, স্বামী নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সম্মতি ছাড়াই শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করতেন, কুইয়ার পরিচয় জানার পর তাকে ‘ছক্কা’ ও ‘হিজড়া’ বলে কটূক্তি করতেন, এবং পণের দাবিতে মানসিক অত্যাচার চলত। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এক দফা মারধরের ঘটনায় শ্বাসরোধ, মাথা দেওয়ালে ঠুকে দেওয়া এবং যৌনাঙ্গে লাঠি দিয়ে আঘাতের অভিযোগও তিনি তুলেছেন। স্থানীয় থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে তা গ্রহণ করা হয়নি বলেও দাবি তার।

৯ ফেব্রুয়ারি ভোরে তিনি বাড়ি ছেড়ে দিল্লিতে এসে কুইয়ার-নারীবাদী সংগঠন Nazariya Foundation–এর সহায়তায় একটি সেফ হাউসে ওঠেন। সেদিনই সংশ্লিষ্ট থানাগুলিতে ইমেল করে জানান যে তিনি স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছেন এবং ফিরতে চান না। এদিকে তার বৈবাহিক পরিবার উত্তরপ্রদেশে নিখোঁজ ডায়েরি করে। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের এক স্টেশন অফিসার জানান, তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার রয়েছে।

১৮ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন পুলিশকর্মী ও তরুণীর স্বামী-আত্মীয়রা দিল্লিতে নজরিয়ার এক কর্মীর বাড়িতে যান। পরে তরুণীকে নিয়ে ফতেপুর বেরি থানায় আনা হয়, যেখানে তিনি আবারও লিখিত ও ভিডিও বিবৃতিতে জানান যে তিনি স্বেচ্ছায় এসেছেন এবং ফিরবেন না।

 

১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর থেকে থানার ভিতরে ও বাইরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উপস্থিত আইনজীবী ও নজরিয়ার কর্মীদের বক্তব্য, প্রথমে ১৫ জনের মতো একটি দল থানায় ঢোকে এবং পরে সংখ্যাটি বাড়ে। তারা “জয় শ্রী রাম” স্লোগান দেয় এবং তরুণীকে ধর্মান্তর করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলে। নজরিয়ার সদস্য ঋতুপর্ণা বোরাহ পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগে জানান, কয়েকজন তাকে ঘিরে ভিডিও তোলে, ধর্মান্তরের অভিযোগ আনে এবং লাঠি দিয়ে মারধর ও খুনের হুমকি দেয়।

বজরং দলের দক্ষিণ দিল্লির জেলা সম্পাদক সুরজ আগরওয়াল ঘটনাস্থলে সংগঠনের উপস্থিতি স্বীকার করলেও হিংসার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, “ভিড়ের কোনও  মুখ থাকে না… যা হয়েছে আমাদের দিক থেকে হয়নি।”

সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। অভিযোগ, বাইরে অপেক্ষারত দুই আইনজীবীর উপর কয়েকজন মহিলা ও পুরুষ মিলে হামলা চালায়—চুল টেনে ধরা, থাপ্পড় মারা এবং মাথা দেয়ালে ঠুকে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে। একইসঙ্গে Queerbeat–এর এক প্রতিবেদককেও ঘিরে ধরে হেনস্তা করা হয়; তার লিঙ্গপরিচয় নিয়ে কটূক্তি ও গালিগালাজ করা হয় বলে অভিযোগ।

দ্য ওয়্যার-এর রিপোর্ট অনুসারে, আইনজীবী ও কর্মীদের দাবি, পুলিশ কখনও বলেছে মামলা উত্তরপ্রদেশ পুলিশের অধীনে, কখনও বলেছে তারা বাইরে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত করার যুক্তিতে নজরিয়ার কর্মী ও আইনজীবীদের থানার বাইরে যেতে বলা হয়, যদিও তরুণী তখনও ভিতরে ছিলেন।

রাত ১১টা নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তরুণীকে এক অজ্ঞাত নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, সঙ্গে ছিলেন পুলিশ, আইনজীবী ও নজরিয়ার কর্মীরা। ফতেপুর বেরি থানার স্টেশন হাউস অফিসার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন।

ঘটনাটি প্রাপ্তবয়স্ক এক মহিলার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, কুইয়ার পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর মানবাধিকার মহলের।