জীবন ও অপরাধের নিষ্ঠুর চিত্রনাট্য অনেক সময় এমন মোড় নেয়, যা বাস্তবকেও হার মানায়। গত ১৮ই জুন পুনের লোহাগড় দুর্গের (৪০০ ফুট উঁচু খাড়া গিরিখাদ থেকে নিচে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছিল ২৫ বছরের তরুণ ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালকে। খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হন কেতনেরই বাগদত্তা, ২০ বছর বয়সী সিয়া গোয়েল এবং সিয়ার প্রেমিক চেতন চৌধুরী। এই রোমহর্ষক ‘হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে যখন গোটা মহারাষ্ট্রের মারওয়াড়ি সমাজে তুমুল আলোড়ন ও ক্ষোভ চলছে, ঠিক তখনই সিয়ার পরিবারের মসলা ও ড্রাই ফ্রুটসের নামি ব্যবসায় বড়সড় থাবা বসাল মহারাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA)।খাদ্য সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন ও ভেজালের সন্দেহে পুনের মার্কেট ইয়ার্ড এলাকায় সিয়ার পরিবারের ঐতিহ্যবাহী দোকান ও গুদামে হানা দিয়ে প্রায় ৮.১৪ লক্ষ টাকার খাদ্যপণ্য বাজেয়াপ্ত করেছেন এফডিএ-র কর্তারা। সেই সঙ্গে দোকানটিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার কড়া নোটিশ ধরানো হয়েছে।
মহারাষ্ট্র এফডিএ (FDA) জানিয়েছে, পুনের মার্কেট ইয়ার্ড এলাকায় সিয়ার বাবা প্রবীণ গোয়েলের মালিকানাধীন ‘মেসার্স বিজি গোয়েল অ্যান্ড কোম্পানি’ (M/s BG Goyal and Company) নামের ওই নামী মশলা ও শুকনো ফলের দোকানে সম্প্রতি আচমকা হানা দেন ফুড সেফটি অফিসাররা।
তদন্তে যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে:
অবৈধ গুদাম ও লাইসেন্স বিতর্ক: সংস্থাটি কোনও বৈধ ফুড লাইসেন্স ছাড়াই একটি বিশাল গুদামঘর পরিচালনা করছিল। আগে সতর্ক করা সত্ত্বেও তারা লাইসেন্সের প্রয়োজনীয় সংশোধন করেনি। বিপুল পণ্য বাজেয়াপ্ত: মোট ৪,১৭২ কেজি সন্দেহজনক ও নিম্নমানের খাদ্যপণ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৮,১৪,৬৩০ টাকা।
ভেজালের সন্দেহ: বাজেয়াপ্ত করা জিনিসপত্রের মধ্যে রয়েছে ১৮৫৬ কেজি হলুদ গুঁড়ো (যা 'সন্ত' ও 'সাধু' ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি হতো), ৫৩৮ কেজি তিল এবং ১৭৭৮ কেজি সয়াবিন বড়ি।
ল্যাব টেস্টের নির্দেশ: বাজেয়াপ্ত পণ্যের ৪টি নমুনা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত ব্যবসার সমস্ত কাজকর্ম অবিলম্বে বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
যদিও এফডিএ-র দাবি, এটি তাদের রুটিন তল্লাশির অংশ এবং এর সঙ্গে কেতন আগরওয়াল হত্যাকাণ্ডের তদন্তের সরাসরি কোনও যোগ নেই। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সিয়ার গ্রেপ্তারির পর গোয়েল পরিবারের ওপর যে তীব্র সামাজিক ও আইনি চাপ তৈরি হয়েছে, এই অভিযান তারই একটি পরোক্ষ প্রভাব।
কেতন আগরওয়াল খুনের নেপথ্যে যে নির্মম ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা ছিল, তা জেনে পুলিশকর্তাদেরও চোখ কপালে উঠেছিল। পুলিশি জেরায় ও ক্রাইম সিন পুনর্নির্মাণে উঠে এসেছে এক হাড়হিম করা সত্য:গত ১৮ই জুন বাগদত্তা সিয়া গোয়েলের জন্মদিন উদযাপন করতে লোহাগড় দুর্গে ট্র্যাকিংয়ে গিয়েছিলেন পেশায় পুনের রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়াল। সিয়ার সঙ্গে গোপনে তাঁর প্রেমিক চেতন চৌধুরীও অন্য একটি স্কুটারে করে সেখানে পৌঁছন। পাহাড়ের চূড়ায় খাড়া গিরিখাদের সামনে কেতন যখন দাঁড়িয়েছিলেন, তখন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সিয়া হঠাৎ মাটিতে বসে পড়েন।
পুলিশ জানিয়েছে, সিয়া ইচ্ছে করেই বসে পড়ার সিগন্যালটি বেছে নিয়েছিলেন। চেতন যখন পেছন থেকে এসে আচমকা কেতনকে ধাক্কা মারবেন, তখন মরণ কামড় হিসেবে কেতন যেন সিয়াকে ধরে তাঁকেও সঙ্গেনিয়ে নীচে পড়ে না যান— তা নিশ্চিত করতেই এই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন সিয়া! সিগন্যাল পাওয়া মাত্রই হুডি পরা চেতন এসে কেতনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন ৪০০ ফুট গভীর খাদে।
প্রথমে এটিকে নিছক ‘দুর্ঘটনা’ বলে সিয়া নাটক করলেও, ফোনের স্ন্যাপচ্যাট চ্যাট ও সিসিটিভি ফুটেজ ঘেঁটে পুলিশ ৫ দিনের মধ্যেই এই খুনের চক্রান্ত ফাঁস করে। নভেম্বর মাসে কেতনের সাথে সামাজিক বিয়ে এড়াতেই সিয়া ও চেতন এই পথ বেছে নেন।
দোকানে এফডিএ-র তালা ঝোলানোর পর অবশেষে মুখ খুলেছেন সিয়া গোয়েলের বাবা প্রবীণ গোয়েল। সংবাদমাধ্যমের সামনে কার্যত ভেঙে পড়ে তিনি বলেন:“আমার মেয়ে যদি অপরাধী হয়, তবে বিচারব্যবস্থা ও আইন অনুযায়ী ওকে কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হোক, আমি আইনের সঙ্গে আছি। কিন্তু কিছু মানুষ এবং সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত আমার গোটা পরিবারকে টার্গেট করছে। দোষ করল মেয়ে, আর শাস্তি ভোগ করছে আমার ব্যবসা ও পরিবার। আমরা চরম মানসিক অবসাদের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।”
বর্তমানে সিয়া ও তাঁর প্রেমিক ইয়েরওয়াড়া সেন্ট্রাল জেলে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন এবং রাজ্য সরকার এই মামলার দ্রুত শুনানির জন্য ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গঠন করেছে। একদিকে মেয়ের ফাঁসির খাঁড়া, অন্যদিকে কোটি টাকার পারিবারিক ব্যবসা সিল হওয়ার মুখে— সব মিলিয়ে গোয়েল পরিবার এখন পুনের টক অব দ্য টাউন।
















