আজকাল ওয়েবডেস্ক: কোজিকোডে অনুষ্ঠিত কেরালা সাহিত্য উৎসবে ২৫ জানুয়ারি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় খাদ্য, ক্ষুধা ও কল্যাণ অর্থনীতি নিয়ে বক্তব্য রাখতে এসে ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে এক ধারালো ও স্পষ্ট অবস্থান নেন। মূল অধিবেশনের ঠিক আগে দ্য ওয়্যার-কে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে তিনি ‘ফ্রি-বি’ বিতর্ক থেকে শুরু করে চরম বৈষম্য, চাকরিহীন বৃদ্ধি, তথ্য সংকট এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।

ভারতে কল্যাণমূলক ব্যয় নিয়ে যে ‘ফ্রি-বি’ বিতর্ক চলছে, তাকে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পূর্ণ একতরফা বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, গরিবদের জন্য সামান্য ভর্তুকি বা সহায়তার ক্ষেত্রে যে নৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন তোলা হয়, ধনীদের জন্য রাষ্ট্র যে বিপুল সুবিধা দিয়ে থাকে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সেই প্রশ্ন কেউ তোলে না। করছাড়, জমি হস্তান্তর, কর্পোরেটদের জন্য নিয়ন্ত্রক ছাড় কিংবা নির্দিষ্ট কয়েকটি বড় সংস্থাকে দেওয়া সরকারি চুক্তির প্রকৃত আর্থিক মূল্য কখনও হিসাব করা হয় না বলেই তাঁর মন্তব্য।

তিনি স্পষ্ট করেন, মধ্যবিত্তের জন্য ভালো রাস্তা বা পরিকাঠামো গড়ে তোলার বিরুদ্ধে তিনি নন। সমস্যা হলো, এমন একটি বয়ান তৈরি করা হয়েছে যেন রাষ্ট্রের বেশিরভাগ ব্যয় গরিবদের পেছনে যাচ্ছে, অথচ বাস্তবে বড় অংশের সুবিধা ভোগ করছে ধনী ও কর্পোরেট শ্রেণি। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র মতো প্রকল্পে দেওয়া করছাড় ও ভর্তুকির  অঙ্ক যদি তথাকথিত ফ্রি-বির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে বিতর্কের চেহারাই বদলে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

পুনর্বণ্টনের ধারণা রাজনীতি থেকে প্রায় উধাও হয়ে যাওয়ায় তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এটি কেবল অর্থনৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও। আজকের ভারতে শুধু গরিব নয়, মধ্যবিত্তও ক্রমশ ধনীদের থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এর ফল হচ্ছে অসন্তোষ ও ক্ষমতার আরও বেশি কেন্দ্রীভবন অতি-ধনী শ্রেণির হাতে। যুক্তরাষ্ট্রে এর পরিণতি হিসেবে যে অলিগার্কিক ও গণতন্ত্রবিরোধী রাজনীতির উত্থান দেখা যাচ্ছে, ভারতের রাজনীতিতেও তার ছায়া স্পষ্ট বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভারতের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ করে বিরোধী রাজনীতির ব্যর্থতার দিকে আঙুল তোলেন। তাঁর মতে, বিরোধীদের ঐক্যহীনতা কাকতালীয় নয়। শাসক দল বিভাজনকে উসকে দেবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিরোধীরা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও সামাজিক ভিত্তি বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে। বম্বে পুরসভা নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিরোধীরা একজোট থাকলে ফল ভিন্ন হতে পারত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও বিশ্ব অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রভাব প্রসঙ্গে বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ভারতের বহু কারখানা ইতিমধ্যেই গভীর সংকটে রয়েছে, কিন্তু এই বাস্তবতা খুব কমই সামনে আসে। টাকার অবমূল্যায়নকে তিনি সেই চাপের একটি লক্ষণ হিসেবে দেখেন। দুর্বল সংস্থাগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অথচ সঠিক তথ্য ও রিপোর্টিংয়ের অভাবে তার প্রকৃত পরিমাণ অনেক বছর পর জানা যাবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অর্থনৈতিক তথ্যের প্রসঙ্গে তিনি আরও কঠোর হন। তাঁর মতে, ভারত কার্যত অন্ধকারে আন্দাজ করছে। ছোট শিল্প, কর্মসংস্থান ও আয় সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি ভয়াবহ। উপরন্তু, অস্বস্তিকর তথ্য প্রকাশ পেলে গবেষক বা আধিকারিকদের শাস্তির মুখে পড়তে হয়—এমন পরিবেশে ভালো তথ্য সংগ্রহ অসম্ভব। NFHS-5 বিতর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প আমলে শ্রম পরিসংখ্যান প্রধানকে বরখাস্ত করার ঘটনাকে তিনি একই প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।

ভারতের বৈষম্য কেবল পরিসংখ্যানেই নয়, দৈনন্দিন জীবনেও দৃশ্যমান বলে তাঁর মত। একদিকে GDP বৃদ্ধির দাবি, অন্যদিকে জাতীয় নমুনা সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী সঞ্চয় কমছে, পারিবারিক ঋণ বাড়ছে। পাশাপাশি শহুরে ভোগ ব্যয়ের  প্রদর্শন—মলে তরুণদের বিপুল ব্যয়—এই ফারাককে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। ইতিহাস বলছে, এই বৈষম্য একসময় সামাজিক ক্ষোভে রূপ নেবেই, এমন সতর্কবার্তাও দেন তিনি।

চাকরিহীন বৃদ্ধি প্রসঙ্গে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এটি নতুন কোনও  বিষয় নয়। বহু বছর ধরেই ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কর্মসংস্থান তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তবু ৮ শতাংশের বেশি বৃদ্ধির হার নিয়ে জাতীয় গর্বের রাজনীতি চলছে, যদিও সেই সংখ্যাগুলোও দুর্বল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর মতে, এই বৃদ্ধির মোহ আসলে কর্মসংস্থান ও বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাখার এক উপায়।

সাক্ষাৎকারের শেষে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে ইউরোপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি জানান, এতে তাঁর অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা কাজের ধারায় কোনও  মৌলিক পরিবর্তন আসবে না। MIT-তে অর্ধকালীনভাবে যুক্ত থাকবেন এবং J-PAL-এর নেতৃত্ব দেওয়া তাঁর কাজের কেন্দ্রে থাকবে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে যে প্রশ্নগুলো নিয়ে তিনি কাজ করে এসেছেন, সেগুলোর প্রতিই তিনি অটল থাকবেন বলে স্পষ্ট করেন।

কেরালা সাহিত্য উৎসবের এই আলোচনায় অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত একটি স্পষ্ট বার্তা রেখে গেলেন—ভারতের অর্থনৈতিক বিতর্ক ভুল জায়গায় আটকে আছে। ‘ফ্রি-বি’ নয়, মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত বৈষম্য, তথ্যের স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ। এই প্রশ্নগুলোর মোকাবিলা না করলে বৃদ্ধির সংখ্যার ঝলকানি দেশের গভীর সামাজিক সংকটকে আড়াল করেই রাখবে।