আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় ইরান–মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–ইজরায়েল সংঘাত ঘিরে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা তীব্র হলেও ভারতের জ্বালানি সরবরাহ আপাতত নিরাপদ রয়েছে বলে শনিবার কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে। কেন্দ্রের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যতই অনিশ্চিত হোক না কেন, দেশের স্বার্থে ভারত সেই উৎস থেকেই অপরিশোধিত তেল কিনবে যেখান থেকে সবচেয়ে অল্প দামে পাওয়া যায়।

 

সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও ভারতের জ্বালানি সরবরাহে এখন পর্যন্ত কোনও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেনি। গত কয়েক বছরে ভারত তেল আমদানির উৎসকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৈচিত্র্যময় করেছে। আগে যেখানে ২৭টি দেশ থেকে তেল আমদানি করা হত, এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০। এর ফলে একটি বা দু'টি অঞ্চলে সমস্যা দেখা দিলেও বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

 

কেন্দ্র স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দেশের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেই তেল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোন দেশ থেকে তেল কেনা হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল নিয়ম হচ্ছে দাম, সরবরাহের স্থিতিশীলতা এবং পরিশোধন শিল্পের চাহিদা। সরকারের ভাষায়, “ভারত এমন জায়গা থেকেই তেল কিনবে যেখানে সবচেয়ে সস্তা এবং সুবিধাজনক দামে পাওয়া যায়।”

 

এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখার বিষয়টিও সরকার নিশ্চিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে সাময়িকভাবে রাশিয়ার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায়, সমুদ্রে থাকা জাহাজে ইতিমধ্যেই লোড হওয়া রুশ তেল ভারতে বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রের বক্তব্য, এই ছাড়কে ‘অনুমতি’ হিসেবে দেখা ভুল হবে।

 

সরকারের দাবি, রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য ভারত কখনও কোনও দেশের অনুমতির ওপর নির্ভর করেনি। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত তিন বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আপত্তি সত্ত্বেও ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি চালিয়ে গেছে। বরং ২০২২ সালের পর থেকে রাশিয়ান তেলের ওপর বড় ধরনের ছাড় পাওয়া এবং ভারতের পরিশোধন শিল্পের চাহিদা বাড়ার ফলে আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রাশিয়াই ভারতের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী।

 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কাছে বর্তমানে কৌশলগত স্টক, বাণিজ্যিক স্টক এবং সরবরাহ স্টক মিলিয়ে ২৫০ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে। এই স্টক প্রায় সাত থেকে আট সপ্তাহের জাতীয় চাহিদা মেটানোর মতো। এর পাশাপাশি দেশের মোট তেল পরিশোধন ক্ষমতা বছরে প্রায় ২৫৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা দেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় বেশি। ফলে প্রয়োজনে ভারত পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিও করতে পারে।

 

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সামরিক অভিযান এবং তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল পরিবহণের ওপর চাপ বেড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।

 

শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একদিনেই প্রায় ৮.৫ শতাংশ বেড়েছে। গত এক সপ্তাহে মোট বৃদ্ধি প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া মন্তব্য। তিনি বলেন, ইরান যদি “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” না করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের শেষ হবে না।

 

এদিকে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে রাশিয়ার ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। ফলে ইতিমধ্যে সমুদ্রে থাকা রুশ তেলবাহী জাহাজগুলির কার্গো ভারতসহ কয়েকটি দেশে বিক্রি করার পথ খুলে যায়। তবে ভারত সরকার মনে করছে, এই পদক্ষেপকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন আমেরিকার অনুমতিতেই ভারত রাশিয়ান তেল কিনছে—যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

 

কেন্দ্রের বক্তব্য, ভারত শুধু তেল আমদানিকারকই নয়, বরং পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের ক্ষেত্রে একটি বড় রপ্তানিকারক দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল, পেট্রোল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ভারত বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে ভারতের তেল বাণিজ্য শুধু দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, বিশ্ববাজারের জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ।

 

অন্যদিকে, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ শুল্ক তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, ভারত নাকি রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু যৌথ বিবৃতিতে এমন কোনও প্রতিশ্রুতির উল্লেখ নেই, এবং ভারত সরকারও এই দাবি নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেনি।

 

সব মিলিয়ে, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেও কেন্দ্রের দাবি—ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনও স্থিতিশীল রয়েছে। তেল আমদানির উৎস বাড়ানো, পর্যাপ্ত স্টক এবং বড় পরিশোধন ক্ষমতা—এই তিনটি কারণে বর্তমান অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা আপাতত কম বলেই মনে করছে সরকার।