আজকাল ওয়েবডেস্ক: হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেও দেশের বাতাস কি আদৌ পরিষ্কার হচ্ছে? সদ্য প্রকাশিত এক রিপোর্ট এই প্রশ্নটাকেই সামনে এনে দিয়েছে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া কেন্দ্রীয় সরকারের ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম বা NCAP যে গভীর সংকটে, তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (CREA)-এর সর্বশেষ মূল্যায়নে।
এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল দেশের সেই সব শহরের বায়ুদূষণ কমানো, যেগুলি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় বায়ুমান মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ। শুরুতে বলা হয়েছিল, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের মধ্যে PM10 কণা ২০–৩০ শতাংশ কমানো হবে। পরে সেই লক্ষ্য বাড়িয়ে ২০২৫–২৬ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সাত বছর পার হয়ে গেলেও রিপোর্ট বলছে- এই লক্ষ্য আর বাস্তবে অর্জন করা সম্ভব নয়।
CREA-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, NCAP চালুর পরেও বহু শহরে দূষণ কমেনি, বরং বেড়েছে। ১০০টি শহরের মধ্যে ২৩টিতে PM10-এর মাত্রা আগের চেয়ে বেশি। যদিও ৭৭টি শহরে কিছুটা হ্রাস দেখা গেছে, তবু তাদের মধ্যে ৬৮টি শহর এখনও জাতীয় সীমার অনেক ওপরে রয়েছে। অর্থাৎ কাগজে কলমে উন্নতির চিহ্ন থাকলেও বাস্তবে বাতাস এখনও বিষাক্তই থেকে গেছে।
লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রেও চিত্র হতাশাজনক। সাত বছরে মাত্র ৫১টি শহর প্রাথমিক ২০–৩০ শতাংশ হ্রাসের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে। সংশোধিত ৪০ শতাংশ লক্ষ্যে পৌঁছেছে মাত্র ২৩টি শহর। CREA স্পষ্ট করে বলেছে, বর্তমান গতি ও কাঠামো বজায় থাকলে ২০২৬ সালের লক্ষ্য পূরণ করা কার্যত অসম্ভব।
https://www.youtube.com/shorts/xqNq-VaicTw
বায়ুদূষণ বিশেষজ্ঞ সারথ গুট্টিকুন্ডা দিল্লির উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করেছেন। তাঁর কথায়, গত ছয় বছরে দিল্লির PM2.5 প্রায় একই জায়গায় ঘোরাফেরা করছে- প্রায় ১০০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার। অর্থাৎ দূষণ কমেনি, শুধু স্থিতিশীল হয়েছে। এক বছরে হঠাৎ ২০–৩০ শতাংশ কমে যাওয়া বাস্তবে কোনওভাবেই সম্ভব নয়।
নজরদারি ব্যবস্থার ঘাটতিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন শহরে যে পরিমাণ বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বসানোর কথা ছিল, তা এখনও পূরণ হয়নি। অনেক শহরে পর্যাপ্ত ডেটা নেই, আবার যেখানে আছে, সেখানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও ভুল পদ্ধতির কারণে তথ্যের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর ফলে দূষণের প্রকৃত চিত্র অনেক সময় আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
দূষণের মাত্রার পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরে। দিল্লি, গাজিয়াবাদ ও গ্রেটার নয়ডার মতো শহরে PM10-এর গড় মাত্রা জাতীয় সীমার তিন গুণের কাছাকাছি। PM2.5-এর ক্ষেত্রে অসমের বাইরনিহাট, দিল্লি ও গাজিয়াবাদ দেশের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় রয়েছে। বিহারের মতো রাজ্যে প্রায় সব নজরদারি-অন্তর্ভুক্ত শহরই নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, NCAP আসলে দেশের দূষিত শহরের খুব সামান্য অংশকেই কভার করছে। স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে CREA দেখিয়েছে, ভারতের প্রায় ৪৪ শতাংশ শহর টানা পাঁচ বছর জাতীয় মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছে। অথচ NCAP-এর আওতায় রয়েছে মাত্র চার শতাংশ শহর। অর্থাৎ অধিকাংশ দূষিত শহর এই কর্মসূচির বাইরেই থেকে গেছে।
অর্থের অভাব নয়, সমস্যাটি মূলত ব্যবহারে। NCAP ও অর্থ কমিশনের তহবিল মিলিয়ে প্রায় ১৩ হাজার কোটির বেশি টাকা বরাদ্দ হলেও ব্যবহার হয়েছে মাত্র তিন-চতুর্থাংশ। কিছু রাজ্য পুরো টাকা খরচ করলেও রাজধানী দিল্লির মতো জায়গায় ব্যবহার হয়েছে এক-তৃতীয়াংশেরও কম। শুধু তাই নয়, এই অর্থের বড় অংশই খরচ হয়েছে রাস্তার ধুলো নিয়ন্ত্রণে, যেখানে শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গৃহস্থালি জ্বালানি বা জনসচেতনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র প্রায় উপেক্ষিত থেকেছে।
CREA এই অবস্থাকে ‘স্ট্রাকচারাল ডিসকানেক্ট’ বলে চিহ্নিত করেছে অর্থাৎ কর্মসূচির কাজকর্ম আর প্রকৃত দূষণ উৎস নিয়ন্ত্রণের মধ্যে গভীর ফাঁক রয়ে গেছে। এখনও প্রায় ৪০টি শহর জানেই না তাদের দূষণের প্রধান উৎস কী, কারণ সোর্স নিয়ে পড়াশোনাই সম্পূর্ণ হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু PM10-এর ওপর জোর দিলে চলবে না। সূক্ষ্ম কণা PM2.5 এবং সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, অ্যামোনিয়ার মতো গ্যাসগুলিকে একসঙ্গে ধরে একটি মাল্টি-পলিউট্যান্ট কৌশল নিতে হবে। পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক ‘এয়ারশেড’ পদ্ধতিতে পরিকল্পনা না করলে দিল্লি বা এনসিআর-এর মতো জায়গায় দূষণ কমানো অসম্ভব।
এই রিপোর্ট প্রকাশের পর কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশ বলেন, এটি ভারতের “সবচেয়ে খারাপভাবে লুকোনো সত্য” দেশজুড়ে বায়ুদূষণ একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সংকট, আর সরকারের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল। তাঁর কটাক্ষ, NCAP এখন কার্যত একটি “নোশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম”-এ পরিণত হয়েছে।
সব মিলিয়ে CREA-এর রিপোর্ট একটাই কথা বলছে নীতির ভাষা, অগ্রাধিকার ও বাস্তব প্রয়োগে আমূল পরিবর্তন না আনলে ভারতের বাতাস পরিষ্কার হওয়ার কোনও বাস্তব সম্ভাবনা নেই। বায়ুদূষণ এখন আর পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি সরাসরি মানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্ন।
