আজকাল ওয়েবডেস্ক: দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর দেবস্মিতা পাল হত্যাকাণ্ডে নয়া মোড়। একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে তদন্তকারীদের হাতে। পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছে, সুপরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে শিবাজি কলেজের এই শিক্ষিকাকে। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অভিযুক্তেরা আগে থেকেই ব্যাগভর্তি করে হামানদিস্তার নোড়া এবং ক্ষুর নিয়ে দেবস্মিতার ফ্ল্যাটে চড়াও হয়েছিল।

 

গত সপ্তাহে পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভের 'সত্যম অ্যাপার্টমেন্টস'-এর ছ'তলার ফ্ল্যাট থেকে দেবস্মিতা পালের মৃতদেহ উদ্ধার হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, পশ্চিমবঙ্গে দেবস্মিতাদের বাড়ির ভাড়াটে দম্পতি এই খুনের ঘটনায় জড়িত। সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের গ্রেফতার করে পুলিশ। ধৃতদের নাম রামপ্রসাদ দাস ও বনশ্রী দাস। অভিযুক্তদের বাড়ি বর্ধমানে। এই ঘটনায় দম্পতির এক নাবালক ছেলেকেও আটক করেছে পুলিশ।

 

তদন্তে জানা গিয়েছে, গত বুধবার একটি প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে বর্ধমানের ওই দম্পতি ও তাঁদের ছেলে দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভে দেবস্মিতার আবাসন চত্বরে পৌঁছয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, নিজেদের পরিচয় লুকোতে তাঁরা মুখে মাস্ক পরে ছিল। শুধু তাই নয়, আবাসনের নিরাপত্তারক্ষী বা অন্য কারও নজর এড়াতে তাঁরা ছ'তলার ফ্ল্যাটে ওঠার জন্য লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করেছিল।

 

 

যেহেতু অভিযুক্তেরা দেবস্মিতার পূর্বপরিচিত ছিল, তাই দেবস্মিতা নিজেই দরজা খুলে তাঁদের ঘরের ভেতরে ডাকেন। ওই ফ্ল্যাটে দেবস্মিতা একাই থাকতেন। সূত্রের খবর, দূর থেকে আসা অতিথিদের সৌজন্যবশত জলও খেতে দিয়েছিলেন তিনি। অভিযুক্তেরা প্রথমে জল খেয়ে নিজেদের তৃষ্ণা মেটান। তার পরপরই পরিকল্পনা মতো দেবস্মিতাকে নৃশংস ভাবে খুন করেন।

 

পুলিশ জানিয়েছে, ঘরের ভেতর ঢুকেই রামপ্রসাদ দাস তার পিঠের ব্যাগ থেকে ভারী হামানদিস্তার নোড়া বের করে আচমকা দেবস্মিতার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। আঘাতের চোটে দেবস্মিতা রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে, রামপ্রসাদ তার ব্যাগ থেকে ধারালো ক্ষুর বের করে দেবস্মিতার দুই হাতের কবজির রগ কেটে দেন, যাতে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত হয়।

 

খুনের পর রক্তমাখা পোশাক বদলে ফেলেন অভিযুক্তেরা। এরপর নীচে অপেক্ষারত সেই প্রাইভেট গাড়িতে চেপেই তাঁরা এলাকা ছেড়ে চম্পট দেন। পুরো ঘটনাটি ঘটে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে।

 

দেবস্মিতাকে বারবার ফোন করেও না পেয়ে তাঁর বোন দেবারতি পালের সন্দেহ হয়। তিনি দিদির ফ্ল্যাটে এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন এবং দেবস্মিতার রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেন।

 

ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ আবাসন চত্বরের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করে। এরপর যে ক্যাবটিতে চড়ে খুনীরা পালিয়েছিল, তার চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ সমস্ত তথ্য পায়। দিল্লির পুলিশের একটি বিশেষ দল ভিন রাজ্যে তল্লাশি অভিযান চালিয়ে শেষমেশ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে ওই দম্পতিকে গ্রেফতার করে।

 

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে খুনের কারণ স্পষ্ট হয়েছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বর্ধমানে দেবস্মিতার একটি পৈত্রিক বাড়ি রয়েছে, যা তিনি তাঁর দাদুর কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন। সেই বাড়িতেই দীর্ঘদিন ধরে ভাড়াটে হিসেবে থাকতেন ওই দাস দম্পতি। বর্তমান বাজারমূল্যে ওই সম্পত্তির দাম কয়েক কোটি টাকা।

 

অভিযুক্তেরা ওই বাড়িটি কিনে নেওয়ার জন্য দেবস্মিতাকে চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু দেবস্মিতা কোনওভাবেই পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করতে রাজি হননি। উল্টো তিনি ওই ভাড়াটে দম্পতিকে বাড়ি খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকেই দেবস্মিতাকে চিরতরে সরিয়ে দিয়ে সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার এই হাড়হিম করা ছক কষেছিল তাঁরা। বর্তমানে ধৃতদের দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।