আজকাল ওয়েবডেস্ক: হিন্দুধর্ম নারীদের কেবল পুরুষের সমান হিসেবেই গণ্য করে না, বরং তাদের অবস্থান পুরুষের চেয়েও অনেক উঁচুতে - এক বিশেষ মর্যাদার আসনে। শবরীমালা মামলার শুনানিতে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে এই যুক্তি তুলে ধরেছে কেন্দ্র। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা ৯ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চের সামনে কেন্দ্রের বক্তব্য তুলে ধরেন। এই বেঞ্চ কেরলের শবরীমালা মন্দির-সহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে নারীদের প্রতি বৈষম্য সংক্রান্ত একাধিক পিটিশনের শুনানি করছে।

সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সারা দেশের এমন বেশ কিছু মন্দিরের উদাহরণ তুলে ধরেন, যেখানে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী পুরুষদের প্রবেশাধিকার সীমিত বা নিষিদ্ধ। তিনি রাজস্থানের পুষ্করের ব্রহ্মা মন্দিরের কথা উল্লেখ করেন। এই মন্দিরে বিবাহিত পুরুষদের প্রবেশের অনুমতি নেই। এছাড়া কেরলের এমন একটি মন্দিরের কথাও তিনি উল্লেখ করেন, যেখানে দেবীর আশীর্বাদ লাভের আশায় পুরুষরা নারীদের পোশাক পরেন।

সলিসিটর জেনারেল যুক্তি দেন যে, ২০১৮ সালের শবরীমালা মামলার রায় (১০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের মন্দিরে প্রবেশের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল) তা মূলত এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছিল যে, পুরুষরাই শ্রেষ্ঠ। তিনি বলেন, হিন্দুধর্মীয় ঐতিহ্যের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বা সামগ্রিক অনুশীলনে এই ধারণার কোনও প্রতিফলন নেই।

সলিসিটর জেনারেল বলেন, "বিনীতভাবে নিবেদন করা হচ্ছে যে, হিন্দুধর্মের অনন্য ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসমূহ (আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস, উপাসনা পদ্ধতি এবং সংবিধানের ২৫ ও ২৬ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রাপ্ত অন্যান্য ধর্মীয় অধিকারসমূহ) কখনওই সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের কষ্টিপাথরে সরাসরি বা হুবহু যাচাই করা সম্ভব নয়। বরং তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করা আবশ্যক।"

তুষার মেহতা আরও বলেন, "হিন্দুধর্মই একমাত্র ধর্ম, যেখানে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই 'নারীশক্তির'  আরাধনার ধারণা বিদ্যমান। হিন্দুধর্ম কেবল নারীদের পুরুষের সমান হিসেবেই গণ্য করেনি, বরং তাদের পুরুষের চেয়েও অনেক উচ্চতর মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, হিন্দুধর্মই বিশ্বের একমাত্র ধর্ম যেখানে কেবল দেবীদের আরাধনাই করা হয় না, বরং পুরুষরাও সেই পবিত্র 'মাতৃদেবীদের' চরণে মাথা ঠেকিয়ে ভক্ত হিসেবে নিজেদের সমর্পণ করেন।"

শুনানির সময় সলিসিটার জেনারেল মোট ছ'টি মন্দিরের উদাহরণ তুলে ধরে যুক্তি দেন যে, লিঙ্গের ভিত্তিতে মন্দিরে প্রবেশের অনুমতির বিষয়টি কোনওভাবেই 'লিঙ্গবৈষম্য' নয়। বরং এটি ধর্মীয় অনুশীলন, বিশ্বাস ও আস্থারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতা বা পরিধির বাইরে অবস্থিত। 

১ কেরলের আত্তুকাল ভগবতী মন্দিরে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে নারীদের একক বৃহত্তম সমাগমের জন্য 'গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস'-এ স্থান করে নিয়েছে, পোঙ্গল উৎসবের মূল দিনে পুরুষরা প্রবেশের অনুমতি পান না।

২. কেরলের চাক্কুলাথুকভু মন্দিরে দেবী ভগবতী পূজিত হন এবং সেখানে প্রতি বছর 'নারী পূজা' নামক একটি বিশেষ আচার পালন করা হয়। এই আচারে মন্দিরের পুরুষ পুরোহিত ১০ দিন ধরে উপবাসরত নারী ভক্তদের পা ধুইয়ে দেন। এই বিশেষ দিনটিকে 'ধনু' বলা হয়। 'নারী পূজা' চলাকালীন সময়ে শুধুমাত্র নারীদেরই মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি থাকে।

৩. পুষ্করে অবস্থিত ব্রহ্ম মন্দিরটি ১৪শ শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী সৃষ্টির দেবতা হিসেবে বিবেচিত ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত এটিই একমাত্র মন্দির। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বিবাহিত পুরুষরা যদি ব্রহ্মার খুব কাছ থেকে পূজা করেন, তবে তাঁদের দাম্পত্য জীবনে নানা অশান্তি বা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই ঐতিহ্যগতভাবে বিবাহিত পুরুষদের এই মন্দিরের মূল গর্ভগৃহে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না।

৪. কন্যাকুমারীতে অবস্থিত ভগবতী আম্মান মন্দিরে দেবী কন্যা কুমারী পূজিত হন। কথিত আছে যে, ভগবান শিবকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার প্রার্থনা জানাতে দেবী সমুদ্রের মাঝখানে অবস্থিত এক নির্জন স্থানে গিয়ে কঠোর ধ্যানে মগ্ন হয়েছিলেন। পুরাণ অনুযায়ী, সতী দেবীর মেরুদণ্ড এই পবিত্র পীঠস্থানে পড়েছিল। এই দেবী 'সন্ন্যাসের দেবী' হিসেবেও পরিচিত। উপরোক্ত কারণগুলোর জন্যই, অবিবাহিত বা ব্রহ্মচারী পুরুষদের মন্দিরের মূল ফটক পর্যন্ত প্রবেশের অনুমতি থাকলেও, বিবাহিত পুরুষদের মন্দিরের সীমানার ভেতরে প্রবেশ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

৫. বিহারের মুজাফফরপুরে অবস্থিত 'মাতা মন্দির'-এ বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পুরুষদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকে। এই নিয়ম এতটাই কঠোর যে, মন্দিরের পুরুষ পুরোহিতদেরও সেই সময়ে মন্দিরের সীমানার ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না। এই নির্দিষ্ট সময়টিতে শুধুমাত্র নারীদেরই মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি থাকে।

৬. কেরলের কোট্টানকুলাঙ্গারা শ্রী দেবী মন্দিরে 'চামায়াবিলাক্কু' নামক এক অনন্য প্রথা প্রচলিত আছে। এই প্রথায় পুরুষরা নারীদের পোশাক পরে দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। এই মন্দিরে আরও একটি প্রথা প্রচলিত আছে, যেখানে ১০ বছরের কম বয়সী বালকরা মেয়েদের মতো সাজসজ্জা করে।

৭. আসমের কামরূপ কামাখ্যা মন্দিরে 'অম্বুবাচী' চলাকালীন পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময়ে দেবী তাঁর বার্ষিক ঋতুচক্র বা মাসিক অবস্থায় থাকেন। এই নির্দিষ্ট সময়ে মন্দিরের সেবাকার্যে শুধুমাত্র নারী পুরোহিতরাই নিয়োজিত থাকেন।

কেন্দ্রীয় সরকার এই মর্মে যুক্তি উপস্থাপন করেছে যে, পিতৃতান্ত্রিক ধ্যানধারণা এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক গতানুগতিক প্রথাগুলো দেশের সভ্যতার মূল চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। এছাড়া শবরীমালা মন্দিরে নারীদের প্রবেশের বিষয়টি আলোচনার ক্ষেত্রে এই ধরনের ধারণার ওপর নির্ভর করার যৌক্তিকতা নিয়েও সরকার প্রশ্ন তুলেছে।