আজকাল ওয়েবডেস্ক: সদ্য মুক্তি পাওয়া আদিত্য ধরের ধুরন্ধর দ্য রিভেঞ্জ ঘিরে তোলপাড় গোটা বিশ্ব। যাঁরা ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছেন তাঁরা এখনও সেই দুনিয়া থেকে বেরোতে পারেননি।
সোশ্যাল মিডিয়া কার্যত এই সিনেমার প্রশংসায় ভরে গিয়েছে। অনেকেই ধুরন্ধরে সিনেমার চরিত্রগুলির সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজছেন। তবে বলিউডে সদ্য মুক্তি পাওয়া ধুরন্ধর কিংবা শাহরুখ খানের পাঠান বা সলমন খানের টাইগার ফ্র্যাঞ্চাইজির মতো স্পাই থ্রিলার জনপ্রিয় হওয়ার বহু আগেই বাস্তবে এমন এক গুপ্তচরের গল্প রয়েছে যা কল্পনাকেও হার মানায়।
পাকিস্তানে গিয়েই বছরের পর এই ব্যক্তি ভারতকে খবর দিয়ে গেছেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ দেশের নজরেও আসেননি। তিনি হলেন, রবীন্দ্র কৌশিক, ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স সংস্থা RAW-এর কিংবদন্তি গুপ্তচর বলেই ধরা হয় তাঁকে।
তিনি ‘ব্ল্যাক টাইগার’ নামেও পরিচিত। জানা যায়, ভারত সরকারের হয়ে কাজ করতে গোপনে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছিলেন কৌশিক। ধুরন্ধর সিনেমায় রণবীর সিং যেমন রেহমান ডাকাতের গ্যাংয়ে যোগ দিয়েছিলেন কৌশিক পাকিস্তানে গিয়ে সেখানকার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
বছরের পর বছর ছদ্মনামে সেখানে থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য, বিশেষ করে সেনাদের কর্মসূচি এবং যাবতীয় অভিযান এমনকী পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত তথ্যও ভারতে পাঠাতেন।
কিন্তু ১৯৮৩ সালে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের হাতে ধরা পড়ে যান। জানা যায়, কৌশিকের জীবনের বাকি সময় কেটে যায় পাকিস্তানের জেলেই। একাংশের মতে, তিনিই ছিলেন বাস্তবের ‘ধুরন্ধর’।
জানা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং তিনিই তাঁকে ‘ব্ল্যাক টাইগার’ উপাধি দেন। ১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরে জন্ম কৌশিকের।
সীমান্তবর্তী এলাকায় বেড়ে ওঠায় পাঞ্জাবি ও স্থানীয় ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি নাটকে অভিনয় করতেন, যা পরবর্তীতে তাঁর গুপ্তচর জীবনে বড় ভূমিকা নেয়।
১৯৭৩ সালে লখনউয়ে একটি জাতীয় নাট্য প্রতিযোগিতায় তাঁর অভিনয় নজর কেড়ে নেয় RAW-এর কর্মকর্তাদের। এরপর দিল্লিতে গোপন প্রশিক্ষণ শুরু হয়। যেখানে ইসলাম ধর্ম, পাকিস্তানি উর্দুর সূক্ষ্ম পার্থক্য এবং ভূগোল সম্পর্কে গভীরভাবে শিক্ষা নেন তিনি।
১৯৭৫ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ‘নবি আহমেদ শাকির’ নামে পাকিস্তানে প্রবেশ করেন কৌশিক। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে আইনে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে মেজর পদে উন্নীত হন।
১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে তিনি ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেন। পাঞ্জাবে সেনা মোতায়েন থেকে শুরু করে কাহুটা পারমাণবিক কেন্দ্রের তথ্য, সবই গোপনে পাঠাতেন তিনি।
এমনকী, তিনি একজন পাকিস্তানি মহিলা আমানতকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের একটি সন্তানও হয়। তবে ১৯৮৩ সালে RAW-এরই অন্য এক এজেন্টের বড় ভুলে ধরা পড়ে যায় পুরো নেটওয়ার্ক।
RAW-এর পাঠানো এক জুনিয়র এজেন্ট ইনায়াত মাসিহ আইএসআইয়ের হাতে ধরা পড়ে যান। জেরায় কৌশিকের যাবতীয় তথ্য ফাঁস করে দেন তিনি। এরপর মুলতানে নির্ধারিত সাক্ষাতের জায়গা থেকে তাঁকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে আইএসআই।
তাঁকে প্রথমে সিয়ালকোটের জেল এবং কোট লাখপত ও মিয়ানওয়ালির উচ্চ নিরাপত্তা জেলে রাখা হয়। ১৯৮৫ সালে পাকিস্তানের সামরিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরে তা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিবর্তিত হয়।
২০০১ সালের ২১ নভেম্বর মিয়ানওয়ালি কেন্দ্রীয় কারাগারে ফুসফুসের যক্ষ্মা ও হৃদরোগে মৃত্যু হয় কৌশিকের। তবে তারপর বহু যুগ কেটে গেলেও ভারতের অন্যতম সাহসী গুপ্তচর হিসেবে রবীন্দ্র কৌশিকের এই কাহিনি আজও রহস্য, ত্যাগ এবং দেশপ্রেমের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রয়েছে।
